স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, এলডিসি উত্তরণ অনিবার্য এবং এ জন্য অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতকে বাস্তবসম্মতভাবে প্রস্তুত হতে হবে। তবে ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা বলেছেন, উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়।
মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকায় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসি বাংলাদেশ) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মতামত উঠে আসে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, এলডিসি উত্তরণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অর্জন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নযাত্রার অংশ। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা সরাসরি যুক্ত।
তিনি বলেন, “অর্থনীতির উন্নয়নের জন্যই এলডিসি থেকে উত্তরণ দরকার। ছোট সুবিধার জন্য আমরা বড় সুবিধা হাতছাড়া করতে পারি না।”
ব্যাংক ঋণের সুদহার নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের জবাবে গভর্নর বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আর কখনো বেঁধে দেওয়া ৬-৯ শতাংশ সুদহারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, বাজারভিত্তিক সুদহারই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই।
তিনি স্বীকার করেন, বর্তমানে সুদহার তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ২০২০ সালের পর থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
গভর্নর বলেন, “এটার তো কমপেনসেট করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, এক পর্যায়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমে গেলেও পরে তা ১১ শতাংশে উঠেছে, যার প্রভাব সুদের ওপর পড়েছে।
সুদহার কমানোর শর্ত ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সুশাসন, কার্যকর তদারকি ও গ্রাহকের আস্থা বাড়লে সুদহার কমে আসবে। খেলাপি ঋণ কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাকে তিনি এর পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে গভর্নর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণের সময় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নীরব ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়েছিল।
অর্থ পাচারের সময়ও তারা সরকারকে থামাতে বলেনি বা কোনো প্রতিবাদ করেনি বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর।
বাংলাদেশকে সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে তুলনা না করার আহ্বান জানিয়ে গভর্নর বলেন, মাথাপিছু আয়সহ উন্নয়নের প্রায় সব সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। আজ হোক বা কাল— এলডিসি উত্তরণ ঘটবেই।
তবে আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, সহজ ঋণ এবং নীতিগত ছাড় হারাবে। এতে আর্থিক খাতে নতুন চাপ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, “এলডিসি উত্তরণ শুধু উদযাপনের বিষয় নয়, এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তন।” তার মতে, এই সময়ে একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রধান ভরকেন্দ্র হবে।
আইসিসি বাংলাদেশ ব্যাংকিং কমিশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ রুমি আলী বলেন, এলডিসি উত্তরণে ব্যাংকিং খাতে যে ঝুঁকি তৈরি হবে, তা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত আগাম আলোচনা ও প্রস্তুতি হয়নি।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণ উন্নয়নের শেষ নয়। বরং এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে ব্যাংকিং খাতকে আরও পরিপক্ব ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান রশিদ বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়বে। কারণ অনেক ব্যাংক তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান।
তৈরি পোশাক খাতের প্রতিনিধি প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো ফজলুল হক বলেন, ২০২৬ সালের নভেম্বরের জন্য দেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এখনকার পর্যায়ে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত জরুরি।
শিল্পগোষ্ঠী ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী সিমিন রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণ শুধু অর্থনৈতিক শ্রেণি পরিবর্তন নয়। এটি নীতিনির্ধারণের সুযোগ ও প্রতিযোগিতার ধরন বদলে দেবে, বিশেষ করে মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত খাতগুলোতে।
তিনি বলেন, ওষুধ খাতে স্থানীয় অ্যাকটিভ ফার্মাসিউট্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট উৎপাদন বাড়ানো এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পিকার্ড বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আমৃতা মাকিন ইসলাম বলেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘ লিড টাইম ও দুর্বল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বাংলাদেশের প্রতিযোগিতায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক শাহ মো আহসান হাবিব। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং খাতকে আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সক্ষম করে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যাংক, শিল্পখাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


