জুলাই আন্দোলনকারীদের হাতে পুলিশ হত্যাকে নিজেদের নতুন রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। বুধবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার (এফসিসি) অনুষ্ঠানে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এ বিষয়টিতেই জোর দিয়েছেন দলটির শীর্ষ থেকে শুরু করে মাঝারি সারির নেতারা।
অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া দলের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হত্যার মতো শক্তি প্রয়োগ করে জুলাই আন্দোলন প্রতিরোধের চেষ্টা করায় আওয়ামী লীগ এখনো সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছে না। এটা বুঝতে পেরেই তারা আন্দোলনকারীদের হাতে পুলিশ হত্যার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এতে পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহানুভূতিও পাওয়া যাবে বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ।
নয়াদিল্লির এই অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতা হত্যার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকেও পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনার ছেলে জয়।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায় নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইবে কি না প্রশ্ন করেছিলেন একজন সাংবাদিক। শেখ হাসিনাকে করা এই প্রশ্নের এর জবাবে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ৩ হাজার ১০০ পুলিশ সদস্য আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত ও আহত হয়েছেন।
আর জয় বলেন, পুলিশ হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দিয়ে সরকার আইন করেছে। এই ইনডেমনিটি তুলে দিয়ে পুলিশ হত্যার বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি চিন্তা করতে পারে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যামামলাও মোকাবিলা করতে পারে।
নিজের দেশে ফেরার দিনক্ষণ নিয়েও সাংবাদিকদের ধোঁয়াশায় রেখেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাংবাদিকরা বিষয়ে জানতে চাইলে শুধু জবাব পেয়েছেন বাংলাদেশের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চান। যখন দেশে ফিরবেন তখন সাংবাদিকরা দেখতে পাবেন বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশের সরকার দেশে ফিরতে বাধা দিলে কী করবেন এমন প্রশ্নেরও সরাসরি কোনো জবাব ছিল না। সরকার কী করবে জানি না-এমন জবাব পেয়েছেন সাংবাদিকরা। এর সঙ্গে সাংবাদিকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় ১৯৮১ ও ২০০৭ সালে সরকারি বাধা উপেক্ষা করে দেশে ফেরার কথা।
দেশে ফেরার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে কি কোনো উপায়ে যোগাযোগ হচ্ছে? কিংবা এ নিয়ে নেপথ্যে কি কোনো শক্তি কাজ করছে? এমন প্রশ্ন করেছিলেন এক সাংবাদিক।
এরও সরাসরি কোনো জবাব পাওয়া যায়নি, বরং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর কথায় পাওয়া গেছে ভারতের ওপর ভরসার ইঙ্গিত। বারবার বলছিলেন ভারত হচ্ছে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু।
ভারত ১৯৭১ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে। ‘শেখ হাসিনা হোমকামিং’ শিরোনামে মিট দ্য প্রেস টাইপের এই অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা আগেই ঘোষণা করেছিল নয়াদিল্লির ফরেইন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া।
ঘোষণায় বলা হয়, প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের কোনো অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নেবেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবশ্য পরে জানানো হয়, সশরীরে কিংবা ভিডিও সংযোগে নয় তিনি অডিওযোগে সরাসরি অনুষ্ঠানে যুক্ত থাকবেন।
এফসিসি’র এই ঘোষণার পরপরই ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞার কথা জানান।
আর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর কাছে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে বসে রাজনীতি করতে না দেওয়ার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
অবশ্য শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার নিয়ে আইনগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, শুধু আদালতের প্রতি বিদ্বেষমূলক কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য প্রচার করা যাবে না।


