সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেকটাই অস্থিতিশীল ছিল। এই অস্থির সময়কে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘আলোর মিছিল’। নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ছবিটি ১৯৭৪ সালের ২৫ জানুয়ারি মুক্তি পায়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম ক্লাসিক ছবিটি এ মুক্তির ৫২ বছর পার করেছে ইতোমধ্যে। নতুন দেশে নিয়ে স্বপ্ন, প্রাপ্তি আর স্বপ্নভঙ্গের গল্প—এই তিনের সংযোগে নির্মিত ‘আলোর মিছিল’ আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে।
ছবিটি সে সময় বাণিজ্যিকভাবেও সফল ছিল। পরিবেশক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিয়া আলাউদ্দিনের মতে, তখন ছবিটির ব্যবসা হয়েছিল প্রায় ২০–২৫ লাখ টাকা। নির্মাণ ব্যয় ছিল এক লাখ টাকার কিছু বেশি।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাটক ‘জল্লাদের দরবার’-এর অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা। ষাটের দশক থেকেই পরিচালনায় সক্রিয় এই নির্মাতা ছবিটিতে খুব সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন স্বাধীনতার পর সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট, দুর্নীতি আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে সরে যাওয়ার করুণ বাস্তবতা।
গল্পের কেন্দ্রে একটি পরিবার। যুদ্ধের আগে স্বল্প বেতনের চাকরি করা একজন মানুষ স্বাধীনতার পর কালোবাজারি ও মজুদদারিতে জড়িয়ে দ্রুত বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তার এই পথ মেনে নিতে পারে না স্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা ভাই কিংবা বন্ধুরা। সমাজজুড়ে তখন মজুদদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিবাদ দমাতে হামলা হয়। সেই সহিংসতার শিকার হয়ে মারা যায় পরিবারের সবার আদরের ভাগ্নি আলো। আলোর মৃত্যুতেই ছবির গল্প পূর্ণতা পায়।
ছবিতে কালোবাজারি খলিল চরিত্রে খলিলউল্লাহ খান, আহত মুক্তিযোদ্ধা রানা চরিত্রে রাজ্জাক, ছাত্রনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আশরাফ চরিত্রে আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছেন। খলিলের স্ত্রী মীনা চরিত্রে রোজী আফসারী, আলো চরিত্রে ববিতা, আর রানার প্রেমিকা দিনা চরিত্রে ছিলেন সুজাতা। প্রত্যেকেই নিজ নিজ চরিত্রে স্মরণীয় অভিনয় করেছেন।
কাস্টিংয়ের বড় চমক ছিল রাজ্জাক ও ববিতাকে মামা–ভাগ্নি চরিত্রে দেখা। এর আগে তারা একাধিক জনপ্রিয় প্রেমের ছবিতে জুটি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ববিতার সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না, কিন্তু গল্প ও দেশাত্মবোধের গুরুত্ব বিবেচনা করেই তিনি চরিত্রটি গ্রহণ করেন।
ছবিতে ববিতার ঠোঁটে লিপ দেওয়া সাবিনা ইয়াসমিনের গান ‘এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে আর ঝরে’ আজও বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম কালজয়ী গান। গানটির সুর করেন সত্য সাহা, কথা মুস্তাফিজুর রহমানের। এফডিসির স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করা হয়।
‘আলোর মিছিল’ শুধু দর্শকদের প্রশংসাই পায়নি, অর্জন করেছে তৎকালীন সময়ের একমাত্র চলচ্চিত্র পুরস্কার বাচসাস। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালক, কাহিনি, গীতিকারসহ শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হন ববিতা। পার্শ্ব চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও অভিনেত্রী নির্বাচিত হন খলিলউল্লাহ খান ও রোজী আফসারী।


