ভোটের মাঠে নিজ দলের পক্ষে প্রচারণার চেয়ে গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে জোরালো ক্যাম্পেইন চালিয়ে আলোচনায় থাকতে চায় জাতীয় পার্টি (জাপা)।
ভালো ফলাফলের কোনো সম্ভাবনা না থাকায় লাভ-ক্ষতির হিসেবে দলটি ‘না’ ভোটের ক্যাম্পেইনকে বেছে নিয়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে নানা আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১৯৫ জন প্রার্থী নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রয়েছে দলটি। যদিও দলটির সাংগঠনিক অবস্থা এখন বেশ নাজুক অবস্থায়।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত দলটির সঙ্গে সথ্যতা রেখে চলা জাপা ‘ফ্যাসিস্ট’র সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় এবারের নির্বাচনে মাঠে নানান চাপে রয়েছে। তারপরও বড় ধরনের বাধাবিপত্তি ছাড়াই নির্বাচনের প্রচারণা চালোচ্ছে জিএম কাদের-এর নেতৃত্বাধানী জাপা।
তাই, দীর্ঘদিনের মিত্র আওয়ামী লীগের ভোটের বাইরে থাকায় দলটির আনুকূল্যতা পেতেও জাপা বেশ কৌশলী। জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বৃহস্পতিবারও বলছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
এছাড়া বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাস করিয়ে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে চায় মনে করে দলটি শেষ পর্যন্ত ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
জিএম কাদের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলছেন, ‘এখন পর্যন্ত তার নির্বাচনী প্রচারণায় কোন বাধা দেওয়া হয়নি। তবে, দলের প্রার্থীদের ওপর দিন গেলেই চাপ বাড়ছে। আগামী দিনে তা আরও বাড়তে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নানা ফন্দিফিকির করে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। বুঝে শুনে আমরা এটি করতে দিতে পারি না। আমরা এ নির্বাচনে শেষ সময় পর্যন্ত ‘না’ ভোটের জোরালো ক্যাম্পেইন চালাব।’
জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের ভোট করছেন রংপুর-৩ ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ ও ৫ আসন থেকে ভোট করছেন।
গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণায় শুরুর দিন থেকে দলের শীর্ষ এই দুই নেতা নিজ নিজ আসনে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। তবে, অন্য দলের মতো জাপার শীর্ষ নেতারা দলের প্রার্থীদের পক্ষে কোন প্রচারণায় নেই।
জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দল এবং সংগঠনগুলো জাপার বিরুদ্ধে তৎপর থাকায় হামলার আশঙ্কা থেকে দলটি কোন নির্বাচনী প্রচারণায় নেই।
দলটির একাধিক সূত্র বলছে, এককভাবে ভোট করে জাপা খুব ভালো কিছু করতে পারবে না তা অনেকটাই নিশ্চিত। কারণ, ১৯৮৬ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাপা এখন ৬ খণ্ডে বিভক্ত। নির্বাচনের আগেও দলটি আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়ে।
এছাড়া পতিত আওয়ামী লীগের শেষ চারটার্মের শাসনামলের শেষদিন পর্যন্ত সহায়তাকারী জাপার সাংগঠনিক অবস্থা নাজুক, ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলেও জনপ্রিয়তা কমেছে হতাশাব্যাঞ্জক হারে। যার ফলে, রংপুর বিভাগ এবং রাজশাহী বিভাগের ১৭ আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি দলটি।
খোদ দলের চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারির আসনে জয়ী হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এমন অবস্থায় নির্বাচনের ফলাফলের থেকে আলোচনায় থাকাটাই যেন জাপার জন্য লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা মনে করছেন, জাপা এবার নির্বাচনী মাঠে তেমন কোন ফ্যক্টর নয়। তাদের আশঙ্কা জাপা নির্বাচনে ভালো ফলাফলের সম্ভাবনা না দেখে ভোট নিয়ে ইস্যু তৈরি করতে চায়। ভোট সুষ্ঠু হলেও শেষ পর্যন্ত দলটি প্রশ্ন তুলতে পারে। তাই দলটির প্রার্থীদের সঙ্গে তারা কোন ধরনের ঝামেলাও করতে চান না।
জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক ও সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আশরাফুজ্জামান আশু টাইমসকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত প্রচারে গিয়ে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়িনি। তবে, তার আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রউফের লোকজন সামনের দিনগুলোতে ঝামেলা করবে বলে আশঙ্কা করছেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। এবারের নির্বাচনে জাপার জন্য খুব ভালো কিছু দেখছেন না তিনি।’
দলটির গাইবান্ধা জেলা শাখার সভাপতি সারওয়ার হোসেন শাহিন বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত ভোটের মাঠে কোন সহিংস ঘটনার শিকার হয়নি। সামনে কী হয় বোঝা যাচ্ছে না। গণভোটে তারা ‘না’ এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।’
এদিকে, সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখাতে জাপা নির্বাচন থেকে সরে আসুক তা চায় না। কারণ, আওয়ামী লীগ এখন সাময়িক নিষিদ্ধ হয়ে নির্বাচনের বাইরে। ফলে, নতুন করে জাপাকে নির্বাচনের বাইরে চলে গেলে ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্নের মুখেও পড়তে পারে সরকার। এ বার্তা এখন বিএনপি ও জামায়াতের হাইকমাণ্ডের কাছেও রয়েছে।


