আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পেতে যাচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। এডিপি’র খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এই দুই খাতের জন্য যৌথভাবে রেকর্ড পরিমাণ ৮৩ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
অবশ্য কাগজে-কলমে এই রেকর্ড বরাদ্দ দেওয়া হলেও অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই অর্থ শেষ পর্যন্ত বাস্তবে কতটুকু কাজে আসবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই চলবে না। খরচের কার্যকারিতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিকরা কেমন সেবা পাচ্ছেন, তার ওপরই সবকিছুর আসল পরীক্ষা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারা কোনো নতুন সমস্যা নয়। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে ফুটিয়ে তোলে। প্রতি বছরই বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হয়, কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারায় সংশোধিত এডিপিতে বাজেট কমিয়ে আনতে হয়।
তারা আরও জানান, সরকারের উন্নয়নের লক্ষ্য ছোঁয়ার জন্য শুধু বড় বাজেট দিলেই হবে না, সেই সঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতাও বাড়াতে হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদনের জন্য সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ বা এনইসি সভায় এডিপির এই খসড়া পেশ করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের খসড়া হিসাব অনুযায়ী, এবারের মোট এডিপির আকার ধরা হয়েছে তিন লাখ আট হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
এর মধ্যে শিক্ষা খাতের জন্য ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট এডিপির ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৩৫ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট এডিপির ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার তুলনায় এই বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ আরও অনেক বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশে শিক্ষা খাতে জিডিপির দুই শতাংশেরও কম খরচ করা হয়। অথচ এটি অন্তত চার থেকে পাঁচ শতাংশ হওয়া উচিত। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতের খরচ জিডিপির এক শতাংশের নিচে রয়েছে, যা বাড়িয়ে তিন থেকে চার শতাংশ করা দরকার।
তবে তারা বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। আসল সুফল পেতে হলে সঠিক সময়ে, সঠিক প্রকল্পে অর্থ খরচ করতে হবে এবং কাজের মানও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে বড় বরাদ্দ দিয়েও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
মুস্তফাকে মুজেরী মাঠপর্যায়ের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন বা অবকাঠামো আছে কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত ডাক্তার, কর্মী ও প্রয়োজনীয় সেবা নেই। তিনি আরও বলেন, শুধু ভবন তৈরি করলেই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয় না।
একইভাবে শিক্ষা খাতেও শুধু খরচের পরিমাণ না বাড়িয়ে খরচের মানের দিকে নজর দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
এই অর্থনীতিবিদ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘদিনের অপচয়, দুর্নীতি ও অদক্ষতার সংস্কৃতির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনেক প্রকল্পে মূল উদ্দেশ্যের বাইরে অপ্রয়োজনীয় বিষয় যুক্ত করা হয়, যা অর্থের অপচয়ের সুযোগ তৈরি করে। প্রকল্পগুলোকে ফলপ্রসূ করতে হলে এই বাড়তি বিষয়গুলো বাদ দেওয়া জরুরি।
গত পাঁচ অর্থবছরের এডিপি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বারবার ওঠানামা করেছে। তবে বাস্তবায়নের দুর্বলতা একই রকম রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ৩১ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ২০ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর আগের বছর শিক্ষা খাতে ২৮ হাজার ১২৯ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ১৬ হাজার ২০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ২৯ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ১৫ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল।
কাগজে-কলমে বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবায়নের চিত্র হতাশাজনকই রয়ে গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের মূল বরাদ্দ ২০ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা থেকে সংশোধিত এডিপিতে ১২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা কমিয়ে দেওয়া হয়। একইভাবে শিক্ষা খাতের মূল বরাদ্দ ৩১ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা থেকে ১১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য থেকে এই সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে মাত্র ৮ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা খরচ করতে পেরেছিল স্বাস্থ্য খাত। শিক্ষা খাতের খরচ ছিল ১৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের খরচ কিছুটা বেড়ে ৯ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা হলেও শিক্ষা খাতের খরচ কমে ১৩ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের খরচ মারাত্মকভাবে কমে মাত্র এক হাজার ৯৩২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যেখানে শিক্ষা খাতে খরচ হয়েছিল ১৩ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বাস্তবায়নের গতি বেশ ধীর। এই অর্থবছরের প্রথম আট মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত শিক্ষা খাত তাদের বরাদ্দের মাত্র ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। অন্যদিকে, এই সময়ে স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবায়নের হার ছিল ২২ শতাংশের নিচে।


