বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব আসন্ন। সেই বিপ্লবের জন্য আমি আপনাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
বুধবার ঢাকার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
শফিকুর রহমান বলেন, বিপ্লব কোনো বয়স মানে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই রাজপথে ছিল। আগামীতেও সবাই তরুণের মতো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং বিজয় ছিনিয়ে আনবে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেনি; এটি ছাত্র ও তরুণ সমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি গণআন্দোলন।
আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলন করেও ফ্যাসিবাদকে বিদায় করতে পারেনি। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের সময় সারা দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় ক্ষমতাসীন সরকার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। তাই এই আন্দোলনের কৃতিত্ব জনগণের, আর নেতৃত্বের কৃতিত্ব তরুণ সমাজের।
জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে টানাটানি কিংবা কাউকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টার সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ১৮ কোটি নির্যাতিত মানুষ।’
আন্দোলনে নিহতদের নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শহীদরা কোনো দলের সম্পদ নন, তারা জাতির সম্পদ। আহত ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া জুলাইযোদ্ধাদের যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারগুলোর সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
শফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর তার অনেকগুলোর বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তিনি গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করলে তার রাজনৈতিক পরিণতি শুভ হয় না।
তিনি বলেন, গণরায়ের প্রশ্নে তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ ও প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো কিছুর বিনিময়ে তারা জনগণের রায় থেকে সরে আসবেন না। জনগণের গণরায়ের পাহারাদার হিসেবে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, শিক্ষাঙ্গনে আবারও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ও ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেখানেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা দেবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, মাত্র কয়েক মাসেই জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করা হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না করে ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি হলে তার পরিণতি ভালো হবে না।
গ্যাসের দাম ও সংকট প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো এবং জনগণের দুর্ভোগ বাড়ানো একটি ভুল নীতি। অতীতের লুটপাটের ধারাবাহিকতা এখনো চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য একটি কলঙ্কমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি জনদুর্ভোগ ইস্যুতে পরদিনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, বিভেদ সৃষ্টি করবেন না। আপনার চারপাশের লোকজন থেকেই আপনার বিপদ, আমাদের কাছ থেকে কোনো বিপদ নেই। আমরা বিদেশি প্রভাবমুক্ত একটি বাংলাদেশ চাই বলেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। নিরাপদ দেশ গড়তে প্রয়োজন হলে সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আজ মানুষের একটাই দাবি—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় পাঁচ বছর নয়, পাঁচ মাসের মধ্যেই সরকারের পতন ঘটানো হবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে হলে গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশের মালিকানা কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, এ দেশের জনগণের। এখন লড়াই শহীদদের বিচার, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার। জনগণকে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ করতে হবে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘৫ আগস্ট মানেই মুক্তি ও গণশক্তির উত্থান। জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে কোনোভাবেই মুছে ফেলা যাবে না। গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনকে আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে। জুলাই ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও পথ দেখাবে।’
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যেরও অবসান হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে আবারও সেই প্রভাবের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গুমের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেই পুলিশ বাহিনীকেই তদন্তের দায়িত্ব দিলে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজনে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসাইন, ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, আমার বাংলাদেশ পার্টির যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত উল্লাহ টুটুল, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনসহ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।


