‘আয়নাবাজি’র শিকার সেই সোনা মিয়া ৪ শর্তে মুক্তি পেলেন

‘আয়নাবাজি’র শিকার সেই সোনা মিয়া ৪ শর্তে মুক্তি পেলেন
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী রমজান আলীর ‘আয়নাবাজির’ শিকার সোনা মিয়াকে জামিনে মুক্তি দিয়েছে আদালত। এক লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ও পরে আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশের পর রমজান আলীর খপ্পরে পড়ে কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তিনি।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান এবং কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওবায়দুর রহমান জানান, সোনা মিয়াকে চারটি শর্তে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।

তাদের তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতের বিচারক বৃহস্পতিবার সোনা মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। ওইদিন সন্ধ্যায় জামিন আদেশ কারাগারে পৌছায়।

আইনজীবী আব্দুল মান্নান জানান, কারাগারে অন্তরীণ থাকা সোনা মিয়াকে জাতীয় পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) অথবা পাসপোর্ট আদালতে জমা প্রদান, প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার হাজিরা, ঠিকানা পরিবর্তন না করা এবং একই সঙ্গে বসতভিটা বা জমি বিক্রি না করার শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দিয়েছে। আমি নিজে সোনা মিয়ার আইনজীবী হিসেবে মামলাটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

এই ঘটনার মূল আসামিকে দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান আইনজীবী সমিতির সভাপতি।

কারামুক্তির পর ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় সোনা মিয়াকে। ছবি: টাইমস

যেভাবে ঘটনার সুত্রপাত

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০২০ সালের ০২ মার্চ। ওইদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন পাঁচজন। মাদক উদ্ধারের পর পুলিশের করা মামলার এজাহারনামীয় ২ নম্বর আসামি সোনা মিয়া। যেখানে তার বাবার নাম লেখা হয় নজির আহমদ এবং বর্তমান ঠিকানা ছিল কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া। আর স্থায়ী ঠিকানা ছিল রামু উপজেলার গর্জনিয়া।

অভিযানের সময় ওই ব্যক্তির কাছে পাওয়া একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির সূত্র ধরে সোনা মিয়ার নাম ও পরিচয় ব্যবহারের কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

আদালত থেকে পাওয়া নথির তথ্যমতে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই সময়ের ডিবি পুলিশের পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২ নম্বর আসামির নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ অনুসন্ধান করেছে। অনুসন্ধানে ‘সোনা মিয়া’র দেওয়া নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম শেষ করার জন্য অনুরোধ করা হয়।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন কথিত সেই ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে গিয়ে পলাতক হয়ে যান।

আরও পড়ুন

আদালত দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওই মামলায় ‘সোনা মিয়া’সহ সংশ্লিষ্ট পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন কক্সবাজারে দায়িত্বরত র‌্যাব-১৫-এর একজন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারের ওয়ারেন্টমূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করা হয়।

র‌্যাবের অভিযানে জন্ম নিবন্ধনের সেই সোনা মিয়া গ্রেপ্তার হলেও আসল অপরাধী রমজান আলী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া কারাগারে যাওয়ার পর জেল সুপারের কাছে দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামিই নন। কারাগারে এসেই জানতে পারেন- তিনি মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।

এই ঘটনা কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে যায় জেলা জজ আদালতে। আর সেখান থেকে যায় কক্সবাজার সদর মডেল থানায়।

তারপর পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ আর ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া এক ব্যক্তি নন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলীও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে আদালতে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একজনের জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে ওই মামলায় তাকেই ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে আসামি করে বিচার চলে এবং পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।

যেভাবে হয় ‘আয়নাবাজি’

আদালতের নির্দেশে গত ২ জুলাই নতুন প্রতিবেদন জমা দেয় সদর থানা পুলিশ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া এক ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান আলী।

পুলিশের প্রতিবেদন মতে, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করেন। কোনো এক সময় সোনা মিয়ার জন্ম নিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি দেখিয়েই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে দুই সময়ের কারাগারে সংরক্ষিত তথ্যেও রয়েছে বড় ধরণের অমিল। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মাতার নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার বাবার নামও মৃত নজির আহমদ উল্লেখ থাকলেও তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।

জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

এ ঘটনায় তদন্ত ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই যখন উল্লেখ করেছিলেন যে- সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা সঠিক নয়, তখন কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলেন এবং পরে মামলার বিচার কার্যক্রমে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, মামলার শুরু থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সোনা মিয়ার প্রকৃত নাম যে রমজান, সেটিও তদন্তে বের করা হয়নি। ফলে প্রকৃত আসামি জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। পরে তার পরিবর্তে প্রকৃত সোনা মিয়াকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

তদন্তকারি কর্মকর্তা ও র‌্যাব যা বলছে

তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ও বর্তমানে বান্দরবানের রুমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মানস বড়ুয়া বলেন, ‘তদন্তকালে মূল আসামির নাম পরিচয় সঠিক পাওয়া যায়নি। সেই হিসাবে চার্জশিট দিয়েছিলাম। মিথ্যা পরিচয় দেওয়ায় ওই আসামিকে কারাগারে রেখে বিচার কার্যক্রম চালানোর কথা বলেছিলাম।’

কক্সবাজারে দায়িত্বরত র‌্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) ও সহকারী পুলিশ সুপার আ. ম. ফারুক বলেন, র‌্যাব ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে আসামি গ্রেপ্তার করেছে। নাম ও ঠিকানা যাচাই করে আসামির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আদালত থেকে যে নাম ঠিকানা দেয়া হয়েছে সেই মতোই সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad