মিরপুরে গার্মেন্টস ও কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ আগুন লাগার পর ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) তানভীর হোসেন বলেছেন, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গুদাম থাকার কথা নয়।
যদিও দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় কার্যক্রম চালিয়ে আসছে রাসায়নিকের গুদামটি। স্থানীয়দের কাছে এটি আলম কেমিকেল ফ্যাক্টরি বলে পরিচিত। তবে এই কারখানায় বা গুদামে কী ধরনের রাসায়নিক নিয়ে কাজ হতো, নিয়ম মেনে রাসায়নিক সংরক্ষণ করা হতো কিনা; সেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
মঙ্গলবার রাতে শিয়ালবাড়ির দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকার ডিসি তানভীর। তিনি বলেন, ‘চোখের দেখাতেই বোঝা যাচ্ছে এই রাসায়নিক গুদাম এমন আবাসিক জায়গার পাশে থাকার কথা নয়।’
ডিসি বলেন, ‘এটি আবাসিক নাকি বাণিজ্যিক এলাকা, সেটা রাজউক বলতে পারবে। তবে জনগণের প্রতি অনুরোধ, এ ধরনের অনিয়ম দেখলে আমাদের জানান। আমরা প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস এবং কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরকে নিয়ে অভিযান চালাব।’
অবৈধ বা অনুমোদনহীন রাসায়নিক কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস কমিটি করবে। আমরা করব কিনা আলোচনা করে জানাব।’
তবে নিহত ও আহতদের সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এর আগে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্টস ও কেমিক্যাল গোডাউনের কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান বা লাইসেন্স ছিল না। কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদনও পাওয়া যায়নি।
সাধারণত বাংলাদেশে এই ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই সেফটি প্ল্যান বা লাইসেন্সে টান পড়ে। তারপর দেখা যায়, দুর্ঘটনা কবলিত ভবন বা কারখানার এসব কিছুই ছিল না। মিরপুরের ঘটনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও কেমিক্যাল গুদামের মালিক বা সংশ্লিষ্ট কারো সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।
এর আগে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় হাজি ওয়াহেদ ম্যানশন নামে একটি ভবনে থাকা রাসায়নিক গুদামের আগুনে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৭১ জন। আগুন এতটাই তীব্র ছিল যে মুহূর্তেই আশপাশের কয়েকটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪ ঘণ্টা চেষ্টার পর সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছিল ফায়ার সার্ভিস।
এ ঘটনার দুই বছর পর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় হাজি মুসা ম্যানশন নামের একটি ভবনের রাসায়নিক গুদামে ফের আগুন লাগে। যে আগুনে মৃত্যু হয় ছয়জনের।
আবাসিক এলাকায় একের পর এক আগুনের ঘটনা ঘটলেও বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম। দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত বিষয়টির ভয়াবহতাও আঁচ করতে পারেন না তারা। ফলে আবাসিক এলাকা থেকেও সরছে না কেমিক্যালের গুদাম।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিরপুরে আগুন লাগার সময় ভবনে ছয়-সাত ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মজুদ ছিল। তাই আগুন নেভাতে রোবট, গ্রাউন্ড মনিটর, পাউডার, ওয়াটার, এনজাইম ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার করা হয়েছে।
আগুনে এত মৃত্যুর কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দোতলা ও তিনতলার বিভিন্ন কর্নারে মরদেহগুলো পাওয়া গেছে। তারা নিচে নামতে পারেননি, আবার ছাদে যাওয়ার দরজাটিও দুই তালা দিয়ে বন্ধ ছিল। ফলে ওপরে বা নিচে যাওয়ার কোনো পথই খোলা ছিল না।’
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আরও জানান, ‘অগ্নিকাণ্ডের শুরুতেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। এতে সাদা ধোঁয়া বা টক্সিক গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত। সম্ভবত এই গ্যাসের কারণেই হতাহতরা প্রথমে অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।’
সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মিরপুরের শিয়ালবাড়ির এ আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ১৬ জন। উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।


