আবারও প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম: এবার ‘ভুতুড়ে আপিল’

আবারও প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম: এবার ‘ভুতুড়ে আপিল’
ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

বগুড়ার সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মহাস্থানগড়ে এক আইনি রহস্যের জন্ম হয়েছে। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পরে নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন (‘লিভ-টু-আপিল’) করা হয়েছে এমন সব কর্মকর্তার নামে, যারা নিজেরা এই বিষয়ে কিছুই জানেন না।

সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি), মহাস্থানগড় জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান এবং শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) আবেদনকারী হিসেবে দেখিয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এই আবেদনের শুনানি শুরু হয়েছে।

অথচ তাদের কেউই এই আবেদন করার কথা স্বীকার করছেন না।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সমর্থনপুষ্ট একটি প্রকল্প। প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের (মহাস্থানগড়) অভ্যন্তরে অবস্থিত শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ারের মাজার এলাকায় নির্মাণকাজের অনুমতি চেয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী।

মন্ত্রণালয় সেই অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্পের জন্য ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। শুরু হয় নারী ইবাদতকারীদের জন্য একটি বিশ্রামাগার তৈরির কাজ।

গত ১৭ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় বগুড়ার জেলা প্রশাসককে একটি চিঠি পাঠিয়ে এই নির্মাণকাজ বন্ধ করতে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কাজ বন্ধ করে দেন।

এর ঠিক পরপরই, নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে এই লিভ-টু-আপিল আবেদন করা হয়।

রোববার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ এই আবেদনের শুনানি শুরু করে। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী মঙ্গলবার দিন ধার্য করা হয়েছে।

কাগজে-কলমে থাকা আবেদনকারীদের বক্তব্য এই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব কানিজ মওলা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে এই মামলার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো লিভ-টু-আপিল আবেদন করিনি। আমরা কোনো পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতেও (ওকালতনামা) সই করিনি।’ তার অজান্তে কিভাবে তার নামে এমন একটি আবেদন জমা পড়ল—জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, ‘সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব আপনাদের (সাংবাদিকদের)।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে যখন এই আবেদনের বিষয়ে জানানো হয়, তখন তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি তো দুই নম্বরে আছি।’ বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত কি না জানতে চাইলে তিনি যোগ করেন, ‘আমি এটি জানতে পেরেছি। তবে এ বিষয়ে আপনার সংস্কৃতি বিষয়ক সচিবের সাথে কথা বলাই ভালো।’

সংস্কৃতি সচিব এই বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন—তা স্মরণ করিয়ে দিলে স্বরাষ্ট্র সচিব পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তিনি যদি না জানেন, তবে তার নিজের মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে আমি কিভাবে জানব?’

বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান ধারণা করছেন, আবেদনটি মন্ত্রণালয় থেকে আসায় হয়তো তার পদবি যুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যদি কোনো আবেদন করে, তবে সেখানে জেলা প্রশাসকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।’

তবে এই জেলা প্রশাসক একই সাথে শাহ সুলতান মাজার কমিটিরও সভাপতি, যে কমিটি এই কাজটি তদারকি করছে। আবার তিনিই এই কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে কারও সাথে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আমার সাথে এই ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি।’

জেলা প্রশাসকের এই ধারণার বিষয়ে সংস্কৃতি সচিবকে পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, ‘না, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি।’

বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ জানান, তাকে এ বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমাকে না জানিয়েই এই আবেদন করা হয়েছে। আপনারা সাংবাদিকরা এখন আমাকে ফোন করছেন। আমি আপনাদের মাধ্যমেই বিষয়টি জানতে পারলাম।’

মহাস্থানগড় জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জানান, তিনি প্রথম ১৫ জুলাই এই আবেদনের কথা জানতে পারেন। এরপরই তিনি আঞ্চলিক পরিচালককে চিঠি দিয়ে জানান, তিনি এই আবেদন করেননি। পরবর্তীতে আঞ্চলিক পরিচালক বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানান।

এই বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আদালত এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।’

শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহিনুজ্জামানও এই বিষয়ে কিছু জানার কথা অস্বীকার করেন।

তিনি ‘টাইমস’কে বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আমার নাম ব্যবহার করে কেউ আপনাদের ভুল তথ্য দিয়েছে।’ আবেদনপত্রে তার পদবি থাকার কথা জানানো হলে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে পরে কথা বলব।’

রোববার আদালতে লিভ টু আপিলের শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

নাম থাকা আবেদনকারীরা কিছুই না জানা সত্ত্বেও মামলাটি কিভাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পৌঁছাল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি সলিসিটর অফিস থেকে এসেছে। তাই আমি এটি পরিচালনা করেছি।’ এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)-এর সভাপতি মনজিল মোরসেদ আবেদনপত্রে নাম থাকা প্রতিটি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে এই আবেদনের বিরোধিতা করেন।

তিনি বলেন, ‘তাদের কেউই এই আবেদন করেননি।’ বিষয়টি তিনি আদালতের নজরে এনেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি যে এই আপিল আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি জানান, আসলে কী ঘটেছে তা খতিয়ে দেখার পর আদালত এ বিষয়ে আবারও শুনানি করবে।

মনজিল মোরসেদ একটি স্ববিরোধী বিষয়ের দিকেও ইঙ্গিত করেন। মহাস্থানগড় মামলায় হাইকোর্টের আগের রায়টি সরকারের পক্ষেই গিয়েছিল। সরকারের নিজস্ব আইনি অবস্থানকে সমর্থন করা একটি রায়ের বিরুদ্ধে সরকার নিজেই কিভাবে আপিল করতে পারে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

এই বিরোধের সূত্রপাত ২০১০ সালের শেষের দিকে, যখন মহাস্থানগড়ের ভেতরে প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ নষ্ট করা, নতুন স্থাপনা নির্মাণ, মাজার সম্প্রসারণ এবং খননকাজ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে এইচআরপিবি একটি রিট পিটিশন দায়ের করে।

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট কর্তৃপক্ষকে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার অবৈধ দখল রোধ করার নির্দেশ দেয়।

মনজিল মোরসেদ বলেন, পরবর্তীতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মাজার এলাকায় নির্মাণকাজের অনুমতি চেয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখেন। মন্ত্রণালয় অস্বীকৃতি জানানো সত্ত্বেও অর্থ বরাদ্দ করা হয় এবং মসজিদ সংস্কার, শৌচাগার ও রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হয়।

তিনি বলেন, ‘এরপর আমি জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলি এবং তিনি কাজ বন্ধ করে দেন। এর পরেই সলিসিটর অফিস ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মাধ্যমে এই লিভ টু আপিল আবেদন করা হয়।’

১৯৭৬ সালে সংশোধিত প্রত্নসম্পদ আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ধ্বংস, ক্ষতি বা বিকৃত করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি এবং ২০২০ সালের ৫ মার্চের হাইকোর্টের আদেশেও মহাস্থানগড়ের সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার সাড়ে সাত কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে যেকোনো ধরনের স্থায়ী নির্মাণকাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

মহাস্থানগড়ের কাস্টোডিয়ান জানান, পুণ্ড্রনগরের ভেতরে একটি মসজিদ ও মাজার রয়েছে। গত ১৫ জুন মাজারের পাশের মাটি খুঁড়ে ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে একটি স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, মীর শাহে আলম নিজেই এই কাজের উদ্বোধন করেছিলেন।

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘তাদের যদি একটি স্থাপনা তৈরি করতে দেওয়া হয়, তবে তারা পরে আরও স্থাপনা তৈরি করবে।’

‘টাইমস’-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেন, আবেদনকারী সব কর্মকর্তাই এই লিভ-টু-আপিল আবেদনের বিষয়ে অবগত ছিলেন।

তারা কেন বিষয়টি জানার কথা অস্বীকার করছেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখানে না জানার কী আছে? তারা এখন কেন অস্বীকার করছে তা আমি জানি না।’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিধিনিষেধের প্রতি তার কোনো আপত্তি নেই উল্লেখ করে তিনি যুক্তি দেন, মাজার ও মসজিদের সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ ২০ বছর ধরে বন্ধ থাকার পর এখন তা পুনরায় চালু করা উচিত।

তিনি বলেন, ‘এলাকার মুসল্লিরা বিভিন্ন দাবি তুলেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আমি তাদের দাবির বিষয়টি দেখতে বাধ্য।’

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার কথা স্বীকার করে শাহে আলম আরও বলেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীও মৌখিকভাবে মাজার ও মসজিদের কাজ করার সম্মতি দিয়েছিলেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad