বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে যাওয়ার পর লিওনেল মেসি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। আর্জেন্টিনাকে শেষবারের মতো জাদুকরী কোনো মুহূর্ত উপহার দিতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে ম্যাচ শেষে তিনি স্বীকার করেন, তুলনামূলক ভালো দল হিসেবেই স্পেন জিতেছে।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের মাথায় ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলেই স্পেন ১-০ ব্যবধানে জয় পায় এবং নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয়। এর ফলে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি পুরুষদের বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ হারায় আর্জেন্টিনা।
গ্যালারিতে উপস্থিত ৮০ হাজার ৬৬৩ জন দর্শকের সিংহভাগই ৩৯ বছর বয়সী মেসির মাথায় আরেকটি মুকুট দেখার জন্য চিৎকার করছিলেন। কিন্তু তার বদলে তারা দেখলেন, মেসি ও তার সতীর্থরা যখন স্টেডিয়ামের দক্ষিণ প্রান্তে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের জল সামলানোর চেষ্টা করছেন, তখন স্পেনের খেলোয়াড়রা মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরছেন।
মেসি বলেন, ‘আমি দুঃখিত, তবে আমি জানি যে আমরা আমাদের মনপ্রাণ উজাড় করে খেলেছি।’
পুরো ম্যাচ জুড়ে স্পেনের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ম্যাচ শেষে গোলপোস্টে শটের দিক থেকে তারা ২০-১ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল এবং আর্জেন্টিনার ৪৩৩টি পাসের বিপরীতে তারা ৮৪৫টি পাস খেলেছে।
মেসি বলেন, ‘সত্যি বলতে, ওরাই ভালো খেলেছে। আমরা ম্যাচটি হেরেছি এবং আমরা তা মেনে নিচ্ছি। তবে এর মানে এই নয় যে আমরা এ পর্যন্ত যা কিছু অর্জন করেছি তা ভুলে যাব। তাই আমি আমার মানুষজন, আমার খেলোয়াড় এবং দেশকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন মেসি। সেই সাফল্যের মাঝেই ছিল টানা দুটি কোপা আমেরিকা জয়। কিন্তু এবার তাকে পরাজয় দেখতে হলো।
মেসি এবারের বিশ্বকাপ শেষ করেন ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১। তবে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের। তিনি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে ২২-এ পৌঁছান। মেসিই প্রথম ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে শুরুর একাদশে খেলেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার গোলসংখ্যা এখন ১২৫, যা কেবল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ১৪৬ গোলের পরেই।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, এই হার মেসির মহানত্বকে একটুও কমিয়ে দেয় না। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, সবাই তার জন্য গর্ব অনুভব করবে। তিনি যা অর্জন করেছেন, তা অসাধারণ। আমার মতে, মাঠে পা রাখা সর্বকালের সেরা ফুটবলার তিনিই।’
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জানান, পুরো ম্যাচে মেসিকে নিষ্ক্রিয় রাখাই ছিল তাদের প্রধান পরিকল্পনা। ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্যই ছিল মেসিকে আটকানো,’ বলেন তিনি।
ম্যাচের প্রথমার্ধে মেসি মাত্র ১৫ বার বল স্পর্শ করেন এবং পুরো ম্যাচে তার বল ছোঁয়ার সংখ্যা ছিল ৫৪। তিনি কখনোই এমন অবস্থানে বল পাননি, যেখান থেকে গোল করতে পারতেন।
শেষ বাঁশি বাজার পর স্পেনের অন্তত ছয়জন খেলোয়াড় মেসিকে সান্ত্বনা দেন। পরে রানার্স-আপ পদক নিতে যাওয়ার সময় স্পেনের খেলোয়াড়রা তাকে গার্ড অব অনার দেন। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেও মেসির মুখে তখন ছিল শুধুই নিস্তব্ধতা।
এই হার আর্জেন্টিনাতেও গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে। বুয়েনস আয়ার্সের ওবেলিস্কের কাছে জয়ের উদ্যাপনের জন্য জড়ো হওয়া সমর্থকেরা পরাজয়ের পর ঠান্ডা ও বৃষ্টিভেজা রাতে শোকমিছিলের মতো পরিবেশে বাড়ি ফেরেন।
২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মার্তি পেরেইরা বলেন, ‘আমি এত কেঁদেছি যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। যেন ট্রয়ের শেষ সৈনিকের মতো ভেঙে পড়েছিলাম।’
জয়ের আশায় কেনা আতশবাজি ও রঙিন ধোঁয়ার বোমা শেষ পর্যন্ত ফোটানো হলেও, আনন্দের বদলে সেখানে ছিল বিষণ্নতার ছাপ।
এটি মেসির শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, যদিও তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি। ফাইনালের আগেই আর্জেন্টিনাজুড়ে আবেগ ধীরে ধীরে উচ্ছ্বাস থেকে নস্টালজিয়ায় রূপ নিতে শুরু করেছিল।
২৭ বছর বয়সী জেনিফার গুয়ারাজ বলেন, ‘মেসির জন্য আমি চতুর্থ তারকাটা খুব দেখতে চেয়েছিলাম। সে এর যোগ্য ছিল।’
তবে অনেক সমর্থকের মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে জয়টাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জেনিফার বলেন, ‘অন্তত আমরা ফাইনালে উঠেছি। ইংল্যান্ড তো এখানেই পৌঁছাতে পারেনি।’শিক্ষার্থী ফ্রাঙ্কো ক্রুজও একই মত প্রকাশ করে বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ই ছিল ‘ফাইনালের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
পরাজয়ের পরও কোচের নামে পরিচিত আর্জেন্টিনার দল ‘লা স্কালোনেতা’ দেশে ফিরলে উষ্ণ সংবর্ধনা পাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ৪২ বছর বয়সী সমর্থক ক্রিস্তিয়ান মাইদানা বলেন, ‘মৃত্যু পর্যন্ত আমি এই দলকে ভালোবাসব।’


