আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া প্রসিকিউশন টিমের কিছু সদস্যকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালের কাজ ত্বরান্বিত করতে পুনর্গঠনের এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে, শিগগিরই আরও প্রসিকিউটর নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
তদন্ত সংস্থাতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কোনো ধরনের বিতর্ক এড়াতে এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করবে সরকার। মামলার সংখ্যা বাড়লেও এই মুহূর্তে নতুন কোনো ট্রাইব্যুনাল গঠনের চিন্তা নেই সরকারের। বরং প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে শক্তিশালী করেই বর্তমান চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে জানান, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় সংস্কার আনা হবে। তবে বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, বর্তমান ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো কারণ এখনো দেখা যায়নি। তবে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সরকার অবশ্যই তা খতিয়ে দেখবে।
ট্রাইব্যুনালের একজন কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কিছু প্রসিকিউটরের মধ্যে এক ধরনের শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা মামলা পরিচালনায় আগের মতো আন্তরিক নন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তদন্ত সংস্থার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুরো বিষয়টি বর্তমানে প্রসিকিউশনের উচ্চপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নিয়োগ পাওয়া চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, চলমান এবং নতুন মামলার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় জনবল সীমিত হওয়ায় কাজ পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এদিকে প্রসিকিউশন টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একজন প্রসিকিউটর এক আসামির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে অর্থ দাবি করেছেন। এ ছাড়া প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ অন্য এক প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। এসব ঘটনা প্রসিকিউশন টিমের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে তারা কোনো আপস করবেন না। কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন। তবে প্রসিকিউশন টিমে কে থাকবেন আর কে বাদ যাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তার নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য ২০১০ সালে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সময়ের হত্যাকাণ্ডগুলোকেও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এখন পর্যন্ত এই ট্রাইব্যুনালে চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ মোট ৫৫ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রায়ের পর্যায়ে রয়েছে আরও চারটি মামলা।
দুইটি ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২২টি মামলার বিচার কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি মামলা রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ ৭৪ জন বেসামরিক ব্যক্তি, ৬৫ জন পুলিশ সদস্য, ২০ জন বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং একজন আনসার সদস্য রয়েছেন।


