দীর্ঘ সময় ধরে ‘সাংগঠনিক অবস্থা নাজুক’ হলেও হঠাৎ করেই বেশ ‘শক্তিশালী মনোভাব’ দেখাচ্ছেন জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা। জাপা নিষিদ্ধের প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও গণঅধিকার পরিষদের দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার দলটির নেতারা দিচ্ছেন ‘মাঠ গরম করা বক্তব্য’। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার শেষ তিন মেয়াদে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ খ্যাত জাপার নেতাদের হঠাৎ এই ‘দৃঢ় মনোভাব পোষণের’ নেপথ্য উৎস আসলে ‘কে বা কারা’, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জাপা নেতা হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন পরিষ্কার জানিয়েছেন তাদের শক্তি হচ্ছে ‘বিদেশি বন্ধুরা’। অবশ্য ‘বিদেশি বন্ধু’ কে সেটা তিনি না বললেনও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, জাপার ক্ষমতার মূল উৎস সুজাতা সিংরা (ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব)।
তবে সাইফুদ্দিন ও দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের দাবি করেন, তাদের মূল শক্তি হচ্ছে জনগণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২৯ আগস্ট জাপা নিষিদ্ধের দাবিতে কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায় নিজ দলীয় কার্যালয়ের সামনে হামলার শিকার হন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই হামলায় জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। নুরের উপর হামলার পর জাপা নিষিদ্ধের দাবিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে জামায়াত, এনসিপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। যদিও বিএনপি দলটিকে নিষিদ্ধ না চেয়ে কৌশলগত অবস্থান নেয়।

এরপর হঠাৎ জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী থেকে শুরু করে দলটির নেতারা বেশ ‘গরম বক্তব্য’ দিতে শুরু করেছেন। ‘আঘাত আসলে পাল্টা আঘাত’, এমন কি ‘ঢাকা ঘেরাওয়ের’ হুমকি দিয়েছেন তিনি। এর আগে দলটির নেতাদের এমন বক্তব্য দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জাপার ক্ষমতার মূল উৎস সুজাতা সিংরা (ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব)। এটি দলটির নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে প্রমাণিত। যেহেতু আওয়ামী লীগ রাজনীতির বাইরে, তাই আমাদের সীমান্তের ওপারের বাসিন্দারা জাপার বিচার হোক সেটি চান না। দলটিকে তারা নির্বাচনে চায়।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই অধ্যাপক আরো বলেন, ‘বিএনপি হয়তো বিশেষ পক্ষকে সন্তুষ্ট ও নির্বাচন ইস্যুতে জাপার ব্যাপরে কৌশলী। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার চার মেয়াদে “ক্ষমতালোভী জাপার নেতারা” কখনো সরকারে আবার কখনো “গৃহপালিত বিরোধী দলে” থেকেছে।’
‘স্বৈরাচার হয়ে উঠতে সহযোগিতা করায় আওয়ামী লীগের মতো জাপা নেতাদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা উচিত,’ বলেন দিলারা চৌধুরী।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৯ আগস্ট নিজ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনে নুরুল হক নুরের উপর হামলাটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা নুরকে আঘাত করে কী বার্তা দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ওই ঘটনার পর রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নেয়। ঘটনার তিনদিন পর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বড় দল বিএনপি জাপা নিষিদ্ধের বিষয়টি এড়িয়ে যায়। তবে, জামায়াত ও এনসিপি জাপা নিষিদ্ধের জোর দাবি জানায়। এরপর জাপা মহাসচিব বলেছিলেন, ‘জাপাকে রক্ষার দায়িত্ব বিএনপির’ — যা নিয়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক সমালোচনা।
গত ৫ সেপ্টেম্বর জাপা নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে ৩০ দলের সংহতি সমাবেশে বিএনপিও নেতারা অংশ নেন। তবে, ওইদিন সন্ধ্যায় ফের জাপা অফিসে হামলার ঘটনায় বিএনপি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানায়। জাপার বিষয়ে বিএনপির এ কৌশলগত অবস্থান দলটিকে সাহস যোগাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
যেহেতু আওয়ামী লীগ এখন রাজনীতির বাইরে তাই জাপাকে ভোটের বাইরে রাখলে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংকটে পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় বিএনপি জাপা নিষিদ্ধ চায় না। এছাড়া জাপা রাজনীতির বাইরে থাকলে জামায়াত ও এনসিপির সুবিধাজনক অবস্থানও বিএনপির মাথায় রয়েছে বলে অনেকের ধারণা।
জামায়াত ও এনসিপির একাধিক নেতা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, জাপার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিএনপি দেখাতে চাইছে– তাদের কথামত ভোটে না আসলে জাপাকে নিয়ে তারা ভোটে যাবে। এমনকী তাদেরকে বিরোধী দলও বানানোর চেষ্টা করা হবে।
তবে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব শহীদ উদ্দিনী চৌধুরী অ্যানি বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ও তাদের সহযোগিতাকারীদেরও বিচার চাই। তবে, নির্বাচনের আগে যেন কোন দল বা কেউ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সেটি বিএনপির মাথায় আছে। জাপার বিচার করবে সরকার।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতও জাপাকে রাজনীতির বাইরে রাখার পক্ষে নয় বলে মনে করছেন অনেকে। দলটি এর আগে যে ভারতের ইশারায় চলেছে, তার বড় প্রমাণ– ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাপার অংশ গ্রহণ। ওই সময় ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং জাপাকে নির্বাচনে আসতে বাধ্য করেছিলেন বলে দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ অপকটে স্বীকার করেছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে আগে ভারত সফর শেষে জাপার বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের দেশে ফিরে বলেছিলেন, ভারতের অনুমতি ছাড়া তিনি বৈঠকের বিষয় বলতে পারবেন না।
দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘জাপা এদেশে একেবারে নতুন দল নয়। অনেক ঘাত প্রতিঘাতেও দল টিকে রয়েছে। যারা জাপাকে নিষিদ্ধ করতে চায় তাদের উদ্দেশ্য আমাদেরকে ভোটের বাইরে রাখা। নতুন করে যারা উড়ে এসে কোন পরিশ্রম না করে ক্ষমতা দখল করতে চায় তাদেরকে জনগণ চায় না।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের শক্তির উৎস জনগণ।’
তবে, জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, “বিদেশি বন্ধুরা” আমাদের শক্তি। এটা অস্বীকার করতে পারি না।’
‘তবে রাজনৈতিক দলের মূল শক্তি জনগণ,’ দাবি তার।
ভারতের সহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে আমাদের চেয়ারম্যান ভোটে যেতে না চাইলেও সুজাতা সিং (ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব) এসে কী করেছে তা সবার জানা।’
জাপার নেতাদের সাম্প্রতিক সক্রিয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণ মাঠে নামতে শুরু করেছে।’
পর্যবেক্ষণ বলছে, ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় পার্টি। ক্ষমতার বাইরে বরাবরই কোনো না কোনো দলের ওপর ‘ভর দিয়ে চলা’ জাপা এখন ছয় খণ্ডে বিভক্ত। তারপরও আওয়ামী লীগ বিএনপির বাইরে ‘তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে জাপার কার্যক্রম চলছিল। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে বজায় ছিল দলটির শক্ত অবস্থান। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে জাপা আওয়ামী লীগের সরকারের অংশীজন হওয়ার পর এর সাংগঠনিক অবস্থান ‘আরো নাজুক’ হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতসহ বেশিরভাগ দল নির্বাচন বর্জন করলেও জাপা ছিল সেই ভোটে। সে সময় নির্বাচনে দলটি একদিকে সরকারের আর অন্যদিকে বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। ২০১৮ সাল ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ইশারার বাইরে যায়নি দলটি। আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে জাপার সহযোগিতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।


