সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে লন্ডনের একটি আইনি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। কিংসলে ন্যাপলি এলএলপি নামের এই প্রতিষ্ঠানটি এক চিঠিতে ট্রাইব্যুনালের এই কার্যক্রমকে বেআইনি এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
গত সোমবার ই-মেইলে আইসিটিতে পাঠানো এই চিঠিতে নির্দিষ্ট কাউকে সম্বোধন করা হয়নি। এমনকি স্বাক্ষরের স্থানেও কোনো আইনজীবী বা ব্যক্তির বদলে শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে। এই ই-মেইলের প্রেরক কিংসলে ন্যাপলির পার্টনার রেবেকা নিবলক।
টাইমস অব বাংলাদেশ চিঠির সত্যতা যাচাই করতে রেবেকার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আইসিটির কাছে ই-মেইলে চিঠি পাঠানোর কথা নিশ্চিত করেন।
এদিকে, চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউশন অফিস কিংবা ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কেউই চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।
ফৌজদারি মামলা এবং প্রত্যর্পণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠানের চিঠিতে গত ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে এ চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকার আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিবিসি বাংলা;কে বলেন, কোনো রায় সম্পর্কে যে কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান বা আইনজীবী মতামত জানাতে পারেন। কিন্তু রায়কে চ্যালেঞ্জ করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা করতে হবে। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকেও আদালতে হাজির হয়ে আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরন করে রায় চ্যালেঞ্জ অর্থাৎ আপিল করতে হবে।
বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র আন্দোলনের ওপর চালানো দমন-পীড়নের ঘটনায় শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। তার বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া, হত্যার আদেশ এবং নৃশংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল।
তবে ১০ পৃষ্ঠার এক চিঠিতে কিংসলে ন্যাপলি দাবি করে, এই বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মৌলিক আইনি অধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠান যুক্তি দিয়েছে যে, অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে এই বিচার সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং আইনি দলের সদস্যদের ওপর ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তোলা হয়েছে চিঠিতে।
কিংসলে ন্যাপলি চিঠিতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে যে সাজা দেওয়া হয়েছে তা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। তারা এই বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতাকেও স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। এই আপত্তির একটি প্রধান দিক হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব।
আইনি প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৪ সালের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের সময় এমন বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিশেষ করে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি ট্রাইব্যুনালে যোগ দেওয়ার মাত্র ছয় দিন আগে হাইকোর্টে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
আইনজীবীদের অভিযোগ, বিচার চলাকালেই তিনি শেখ হাসিনার অপরাধ সম্পর্কে পূর্বনির্ধারিত ধারণা পোষণ করতেন। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের আগস্টে আদালতকক্ষে তার একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে তিনি রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীকে বলেছিলেন, ‘আপনার মক্কেলদের ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে বাঁচাতে আপনি আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন’।
কিংসলে ন্যাপলির মতে, এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে রায়ের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।
তদন্ত ও প্রসিকিউশন দলের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে লন্ডনের এই প্রতিষ্ঠানটি। তারা সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলামের ভূমিকার সমালোচনা করে বলে, তিনি অতীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া বিচার চলাকালীন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিভিন্ন সমাবেশে তার অংশগ্রহণকে পক্ষপাতমূলক বলে অভিহিত করা হয়।
চিঠিতে একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়েও আইনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। কিংসলে ন্যাপলি বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে ট্রাইব্যুনালের আইনে যে সংশোধনী এনে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বাইরে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা একটি ‘আইনি অসম্ভব’ এবং বেআইনি সম্প্রসারণ।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এই ধরনের মামলাগুলো নিয়মিত ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হওয়া উচিত ছিল। তারা সতর্ক করে বলে, ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমান।
কিংসলে ন্যাপলি এই রায়কে অবিলম্বে বাতিল ও আইনত অকার্যকর ঘোষণার দাবি জানিয়েছে এবং আগামী ১৪ দিনের মধ্যে এর জবাব চেয়েছে। অন্যথায় শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে প্রতিকার চাইতে পারেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


