ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ সন্দেহে কয়েক দফায় মেরে থানার সামনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ সময় তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন, বাইকের চাবি ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।
সোমবার ভোর রাতে সেহরির সময় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী রাহিদ খান পাভেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
পাভেল সাংবাদিকদের জানান, তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েটের) কাজী নজরুল ইসলাম হলের ক্যানটিনে সেহরি খেতে গিয়েছিলেন। সেখানে ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, সে সময় ‘কোনো কারণ ছাড়াই’ ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে ২০ থাকে ২৫ জনের একটা দল তাকে ‘দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা’ মারধর করেন।
এ ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন ছাত্রশক্তির ঢাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসিব আল ইসলাম, সর্দার নাদিম মোহাম্মদ শুভ, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও আবরারসহ আরও বেশ কয়েকজন।
পাভেল বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি–আমার কোনো দোষ থাকলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হোক, কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেনি।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় তাকে মারধর করার পর তাকে আবারও পলাশী চত্বরে গিয়ে মারধর করা হয়। তারপর তাকে মোটরসাইকেলে করে ঢাবির ভিসি চত্বর এলাকায় নিয়ে আসলে সেখানেও ‘কিল-ঘুসি’ মারে ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা।
‘আমার সারা শরীরে ব্যথা করছে, মুখ দিয়েও রক্ত বের হচ্ছে। তারা বাইকের চাবি দিয়ে আমার মুখে ঘুসি মেরেছে। বেল্ট দিয়ে আমাকে পিটিয়েছে। দুই পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে মারধর করেছে। এমনকি মাটিতে ফেলে সারা শরীরে লাথিও দিয়েছে। আমি একটুও মুভ করতে পারছি না।’
পাভেল আরও বলেন, ‘পরে আমাকেশাহবাগ থানায় ফেলে দিয়ে যায়। তারা আমাকে ছাত্রলীগ বলে পেটায়। আমি কখনো কোনো সংগঠনে ছিলাম না। আমার কোনো পদ নেই।’
এ অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা বুয়েটে খাচ্ছিলাম। সেখানে পাভেল ৫-৬ জনকে নিয়ে বসে সেহরি করছিল। তখন হাসিব গিয়ে তাকে প্রশ্ন করে “তুমি তো হল থেকে বয়কট, এখানে আসলে কেন?” এ নিয়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়।’
পাভেলকে কয়েক দফা মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তাকে মারিনি। আমি শুধু ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলাম। সেখানে বলেছিলাম, যেন তাকে থানায় দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি চাইলে বুয়েটের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে পারেন। আমি বসে খাচ্ছিলাম। হাসিবরা তাকে নিয়ে গেছে। রাস্তায় অবশ্যই তাকে মারা হয়েছে, তা না হলে এই অবস্থা হতো না।’
ভুক্তভোগী পাভেল ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত, এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেননি ছাত্রশক্তির এই নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, পাভেল জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। তবে সেই অভিযোগেরও কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি সাইফুল্লাহ। পরে তিনি টাইমসের প্রতিবেদককে পাভেলের নামসংযুক্ত ‘যেসব শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারবে না’ শিরোনামের একটি তালিকা পাঠান। সাইফুল্লাহ বলেন, ‘এটা জুলাইয়ের পরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল থেকে তাকে বয়কট করেছে এটির তালিকা।
মারধরের ঘটনায় ছাত্রশক্তির অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে তো আমি মারিনি। হাসিব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন করে। আর শুভ এখনো আমাদের কমিটিতে কোনো পদ পায়নি।’
এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসিব আল ইসলামকে ফোন দেওয়া হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
শাহবাগ থানার তদন্ত পরিদর্শক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আজ সেহরির সময় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। এখন তিনি পুলিশের হেফাজতে আছেন। তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি আগে সুস্থ হোক, তারপর তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না জানতে চাইলে প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাদের কাছে এ নিয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে আমি ঘটনার ব্যাপারে জানার পর সেই ছেলেকে মেডিকেল ট্রিটমেন্টের জন্য শাহবাগ থানাকে রিকুয়েস্ট করেছি। এখন তাকে মেডিকেল ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। আমরা তার খোঁজ-খবর রাখছি এবং অভিযুক্তদের বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’


