আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সরকার নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোর প্রচেষ্টা চালালেও তাতে এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ এসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে আসছে ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদরা। তাদের মতে, নানা অমীমাংসিত বিষয়ে সরকার দ্রুত ও শক্ত পদক্ষেপ না নিলে নির্বাচন পেছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। তবে, নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা নয়, সরকারের শক্ত প্রশাসনিক কাঠামো এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু এবারের বাস্তবতা তার উল্টো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘সঠিক সময়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চাইলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ভোটে অংশ নিতে পারবে কি না—সে বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে মুহাম্মদ ইউনূসকে। দ্রুত ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত না নিলে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের উদ্যোগ নেয়। রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারে সরকার পর্যায়ক্রমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনসহ ১১টি কমিশন গঠন করে। তবে, এসব কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো হলেও দৃশ্যমান সংস্কার খুব একটা হয়নি।
দুই দফা মেয়াদ বৃদ্ধির পর আসছে ৩১ অক্টোবর শেষ হতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (এনসিসি) কার্যকাল। এই কমিশন মূলত জুলাই সনদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য আনতে কাজ করলেও এখনো দলগুলোর মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয়ে দলগুলো একমত হলেও সময়সূচি নিয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে। বিএনপি চায় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একদিনে হোক। কিন্তু জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই চায় চলতি মেয়াদেই কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে স্পষ্ট সুপারিশ দিক।
নতুন করে যুক্ত হয়েছে আরেকটি চ্যালেঞ্জ—গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন। এতে জোট করলেও প্রার্থীদের নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সরকার নীতিগতভাবে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলেও বিএনপি এতে আপত্তি জানিয়েছে, যা এখন বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থার সংকট। বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পর্যন্ত ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অভিযোগ করছে, ইসি বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। আবার আরপিও সংশোধনীর পর বিএনপিও ইসির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা শুরু করেছে।
এ ছাড়া জনপ্রশাসনে এখনো স্থিতিশীলতা আসেনি। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি বলছে—বর্তমান প্রশাসন রেখে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
জুলাই বিপ্লবের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের বিষয়ে বিএনপির কৌশলী অবস্থানের বিরোধিতা করছে জামায়াত ও এনসিপিসহ অন্যান্য দল। ফলে দলগুলোর মধ্যে বিভাজন এখনো গভীর।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার এখনো সম্পূর্ণ সফল হয়নি। তাই নির্বাচনের আগে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো দল নির্বাচনে গেলেও জনগণ তা গ্রহণ করবে না। যাদের আত্মত্যাগে এখনকার সরকার, তাদের স্বীকৃতি দিতেই উপদেষ্টারা গড়িমসি করছেন। সনদ বাস্তবায়ন না হলে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন ভেস্তে যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসির দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই, সরকারেও নির্বাচন পরিচালনার মতো দক্ষ জনবল নেই। প্রশাসনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর তদারকি দেখা যাচ্ছে না। ফলে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশের মতো বহু কারণ রয়েছে।’
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ বিরাজ করছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণদাবি পূরণে ব্যর্থ হলে আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যাব।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘জুলাই সনদসহ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে, যা নির্বাচনের অনিশ্চয়তা আরও বাড়াবে।’
এনসিপি নেতারাও সাম্প্রতিক সময়ে একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর এই স্পষ্ট বিভাজনই ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।


