বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘অনন্ত প্রেম’ একটি বিশেষ ছবি। ১৯৭৭ সালের ১৮ মার্চ মুক্তি পাওয়া ছবিটি শুধু দর্শকপ্রিয়ই হয়নি, বরং নানা কারণে সময়ের তুলনায় সাহসী ও ব্যতিক্রমী বলেও বিবেচিত হয়। এটা ছিল কিংবদন্তি নায়ক রাজ্জাকের পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র এবং প্রথম কোনো বাংলাদেশি ছবিতে চুম্বন দৃশ্য ছিল।
তবে ছবিটির পরিচালনার শুরুটা রাজ্জাকের হাতে হয়নি। মূল পরিচালক ও প্রযোজক ছিলেন সে সময়ের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র সম্পাদক বশীর হোসেন। ১৯৭৪ সালে খান আতাউর রহমান চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার কাজী আজিজ আহমেদকে দিয়ে ‘অমর প্রেম’ নামে একটি চিত্রনাট্য লেখান। পরে বশীর হোসেন সেটি পরিচালনার আগ্রহ দেখান। কিন্তু একই সময়ে একই নামে আরেকটি ছবি নির্মাণ শুরু হওয়ায় নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘অনন্ত প্রেম’। বশীর হোসেন নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকেই ছবিটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং রেজা লতিফের চিত্রগ্রহণে রাজ্জাক, ববিতা ও অন্যদের নিয়ে কিছুদিন শুটিংও করেন।
কিন্তু অসুস্থতা, সম্পাদনার কাজের চাপ এবং আর্থিক সমস্যার কারণে ছবিটির কাজ মাঝপথে থেমে যায়। ঠিক সেই সময় রাজ্জাক ছবিটি পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রথমে বশীর হোসেনের প্রযোজনাতেই তিনি কাজ শুরু করেন। পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে রাজ্জাক পুরো ছবির স্বত্ব কিনে নেন এবং নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘রাজলক্ষ্মী প্রডাকশনস’-এর ব্যানারে ছবিটি সম্পূর্ণ করেন। সুরকার খন্দকার নূরুল আলমের পরিবর্তে আজাদ রহমানকে নেওয়া হয়, কয়েকটি গান নতুন করে করা হয় এবং কাজী আজিজ আহমেদ চিত্রনাট্যে কিছু পরিবর্তন আনেন। এরপরই ছবিটি মুক্তির জন্য প্রস্তুত হয়।
ছবিতে রাজ্জাক ও ববিতার পাশাপাশি অভিনয় করেন এটিএম শামসুজ্জামান, খলিল, ব্ল্যাক আনোয়ারসহ আরও অনেকে।
গল্পের শুরু বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। রাজ্জাক ও তার তিন বন্ধু—খলিল, এটিএম শামসুজ্জামান ও ব্ল্যাক আনোয়ার—একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সহপাঠী ববিতাকে পছন্দ করে খলিল। বন্ধুরা মিলে পরিকল্পনা করে নির্জন স্থানে ববিতাকে ভয় দেখিয়ে সাজানো মারামারির মাধ্যমে খলিলকে নায়ক বানানো হবে। পরিকল্পনা সফলও হয়। কিন্তু পরে খলিল ববিতাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নির্জনে নিয়ে তার ওপর জোরজবরদস্তি করতে যায়। ববিতার চিৎকার শুনে রাজ্জাক ও বন্ধুরা পৌঁছালে ধস্তাধস্তির মধ্যে রাজ্জাকের হাতে খলিল মারা যায়। ববিতার সম্মান রক্ষায় রাজ্জাক একাই হত্যার দায় নেয় এবং পরে পুলিশ হেফাজত থেকে পালায়। অন্যদিকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে ববিতাও পালিয়ে যায়। ট্রেনে তাদের দেখা হয় এবং তারা পালিয়ে আশ্রয় নেয় পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অরণ্যে। সেখানে একে অপরের প্রেমে পড়ে তারা। এদিকে পুলিশের গুলিতে দুই বন্ধু মারা যায় এবং সত্য প্রকাশের আর কেউ থাকে না। শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাদের খুঁজে পায়; পালাতে গিয়ে একটি ঝর্ণার কাছে পুলিশের গুলিতে দুজনেই মারা যায়।
ছবির শেষ দৃশ্যে রাজ্জাক ও ববিতার একটি গভীর চুম্বনের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সাহসী বলে মনে করা হয়। প্রথমে ববিতা এই দৃশ্যে অভিনয় করতে রাজি ছিলেন না। পরে রাজ্জাক তাকে বুঝিয়ে রাজি করান। তবে শুটিংয়ের পর ববিতা খুবই অস্বস্তি বোধ করেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। বিষয়টি বুঝে রাজ্জাক তাকে আশ্বস্ত করেন—দৃশ্যটি ভালো না লাগলে বাদ দেওয়া হবে।
পরে ছবিটি দেখে ববিতা নিজেই দৃশ্যটি রাখতে রাজি হন। তবু শেষ পর্যন্ত রাজ্জাক সেটি বাদ দেন। তিনি মনে করেছিলেন, এমন দৃশ্য ববিতার ভবিষ্যতের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। ছবির মুক্তির আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, অনেক ভক্ত এবং মা-বোনের অনুরোধের কথাও ভেবেই দৃশ্যটি বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও সেন্সর বোর্ড সেই দৃশ্যের অনুমতি দিয়েছিল।
ছবিটির গানগুলোও দর্শকের কাছে দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। সংগীত পরিচালনা করেন আজাদ রহমান। ‘আলো তুমি নিভে নিভে যাও’, ‘তোমারই কাছে আমি বারবার আসবো’, ‘ঐ কোর্ট কাচারির এমনই রায়’ এবং ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি’—এই গানগুলো আজও স্মরণীয়। বিশেষ করে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি’ গানটি খুরশীদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে বাংলা চলচ্চিত্রের এক ক্ল্যাসিক গানে পরিণত হয়েছে। গানটির শুটিং হয়েছিল কাপ্তাইয়ের মনোরম লোকেশনে।


