জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ এবং তার স্ত্রী সাবিকুন্নাহার মুন্নী। এ দুজনের দখলেই রয়েছে দলীয় অন্তত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদ, যা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
বিশেষ করে সম্প্রতি সাবিকুন্নাহার মুন্নীকে সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াত মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকে বিষয়টি আলোচিত আলোচনায় উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত নেতারা সব সময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে পরিবারতান্ত্রিক দল হিসেবে ব্যাখা করে থাকেন। এখন সে দলেই কৌশলে একই পরিবারের হাতে শীর্ষ একাধিক পদ থাকায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মতিউর রহমান আকন্দ বর্তমানে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত জামায়াতের সংগঠন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
অন্যদিকে, তার স্ত্রী সাবিকুন্নাহার মুন্নী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ পরিষদের সদস্য, জামায়াতের মহিলা বিভাগের মানবসম্পদ, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সেক্রেটারির দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের মহিলা শাখারও সেক্রেটারির দায়িত্ব রয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর হাতে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে থাকায় হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, দলে কি যোগ্য নেতৃত্বের অভাব?
মতিউর রহমান আকন্দ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জামায়াতের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে একই পরিবার থেকে একাধিক সংসদ সদস্য হবেন না। আমরা সে বিষয়ে অনড়। যে কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিরোধীদলীয় নেতার স্ত্রী এবং উপনেতা তাহের সাহেবের স্ত্রী সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাননি। মুন্নি আমার স্ত্রী হিসেবে নন, সংগঠনের দায়িত্বশীল হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন।’
স্বামী-স্ত্রী দুজনই আইনজীবী। মতিউর ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি এবং তার স্ত্রী মুন্নী ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাবেক সভানেত্রী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৫ আসনে জামায়াত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন মতিউর রহমান। তিনি নির্বাচনে পরাজিত হলেও দলীয় সিদ্ধান্তে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন তার স্ত্রী সাবিকুন্নাহার মুন্নী। এর মাধ্যমে তিনি সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাচ্ছেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আকন্দকে নিয়ে অসন্তোষ পুরোনো
মতিউর রহমান আকন্দ বেশ আগে থেকেই দলীয় আইনগত বিষয়গুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত মামলার সময় দলের পক্ষে আইনি লড়াইকে কেন্দ্র করে দলটির সাবেক আইনজীবী তাজুল ইসলামের সঙ্গে তার মনোমালিন্যের ঘটনা দলীয় রাজনীতিতে আলোচিত ছিল। পরবর্তীতে তাজুল ইসলামের দলত্যাগ সেই বিরোধকে আরও সামনে নিয়ে আসে।
এ ছাড়া ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাডভোকেট গিয়াস উদ্দিন মিঠু, আব্দুল বাতেন, ইউসুফ আলী ও শিশির মনিরের মতো যোগ্যাতা সম্পন্ন আইনজীবী থাকা সত্ত্বেও আকন্দের মতো একজনকে সেক্রেটারি করায় ক্ষোভ রয়েছে।
গত ২৯ মার্চ নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলকে রুহুল কুদ্দুস কাজলকে ফুল দেওয়ার একটি অনুষ্ঠানে সিনিয়র আইনজীবীদের পেছনে রেখে নিজে সামনে থেকে অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দলীয় অঙ্গনে সমালোচনা তৈরি হয়। তবে তার প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে প্রকাশ্যে খুব কম নেতাকর্মীই এ বিষয়ে কথা বলতে সাহস পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব সমালোচনার জবাবে জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমসকে বলেন, ‘জামায়াত কখনো ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, বরং যোগ্যতা ও ত্যাগের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেয়।
তার ভাষায়, আকন্দের স্ত্রী মুন্নী ছাত্রী সংস্কার সভানেত্রী ছিলেন। তিনি এখন কর্মপরিষধ সদস্য হিসেবে মহিলা বিভাগের একটি দায়িত্বে রয়েছেন। যোগ্য মনে করেই দল মনোনয়ন দিয়েছে। এটি জামায়াতর নীতর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
সাবিকুন্নাহার মুন্নীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বাইরে রয়েছেন পরে কথা বলবেন বলে টাইমসকে জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতিতে পারিবারিক প্রভাব নতুন কিছু নয়। তবে, বিশেষ করে জামায়াতে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় নেতৃত্বের বিকাশ ও ভারসাম্যের প্রশ্ন তুলতে পারে। কারণ, তারা সবসময় অন্যদলকে পরিবারতন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেন।


