আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কাভার করতে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি), যা দেশের ক্রীড়া সাংবাদিক মহলে ব্যাপক বিস্ময় ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ দলকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার দুই দিন পর এই তথ্য সামনে আসে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর এটিই বাংলাদেশের জন্য প্রথম বড় ধরনের ধাক্কা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপ কাভারের জন্য বাংলাদেশি সাংবাদিকরা অ্যাক্রেডিটেশনের আবেদন করেছিলেন। তবে আইসিসির একযোগে প্রত্যাখ্যান তাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যখন আইসিসির সঙ্গে ভেন্যু ভারতে না রেখে শ্রীলঙ্কাকে সহ-আয়োজক করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল, তখন দ্য ডেইলি সানের ফটোসাংবাদিক তানভিন অঞ্জুম তামিমের অ্যাক্রেডিটেশন প্রথমে অনুমোদন দেয় আইসিসি। এমনকি ভারত ও শ্রীলঙ্কার ভিসা লেটারও পাঠানো হয়। কিন্তু সোমবার হঠাৎ করেই তার অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা হয়।
এর আগে ভারতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপও কাভার করা তামিম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ১৭ জানুয়ারি আইসিসি তার অ্যাক্রেডিটেশন ও দুই দেশের ভিসা লেটার নিশ্চিত করেছিল। ‘কিন্তু সোমবার দুপুর ২টা ৫২ মিনিটে তারা জানায় আমার অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি খুবই অদ্ভুত। ভবিষ্যতের আইসিসি ইভেন্টে আদৌ অ্যাক্রেডিটেশন পাব কি না, তা নিয়েও আমি শঙ্কিত,’ যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ দল এই টুর্নামেন্টে খেলছে না, তবে দেশটি আইসিসির পূর্ণ সদস্য। অতীতে দল অংশ না নিলেও বাংলাদেশি সাংবাদিকরা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট কাভার করেছেন। কিন্তু বর্তমান আইসিসি নেতৃত্বে এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একসময় বাংলাদেশ আইসিসির বড় টুর্নামেন্টে অংশ না নিলেও বিদেশে গিয়ে সাংবাদিকরা নির্বিঘ্নে কাভার করতেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন ৩৪ বছর ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট কাভার করা জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক আরিফুর রহমান বাবু।
বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসজেএ) সভাপতি বাবু বলেন, ‘১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলেনি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও জটিল ছিল, তবু আমি, উৎপল শুভ্র ও দিলু খন্দকার পুরো টুর্নামেন্ট কাভার করেছি। গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল ও ফাইনাল–কোথাও বাধা ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদটি শুনে আমি স্তম্ভিত। বাংলাদেশ না খেললেও আগে আইসিসি ইভেন্ট কাভার করার সুযোগ পেতাম। এবার পুরো বিশ্বকাপের অ্যাক্রেডিটেশন একসঙ্গে বাতিল-এর কোনো যুক্তি দেখি না। ভারতে না গেলে শ্রীলঙ্কা থেকেও তো কাভার করা যেত।’
আইসিসি বিসিবির নিরাপত্তা বিভাগে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের তৈরি নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল, যেখানে ভারতে ম্যাচ হলে দর্শক ও সাংবাদিকদের জন্য ‘মৃদু থেকে মাঝারি’ ঝুঁকির কথা বলা হয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সেই প্রতিবেদন কার্যত বিবেচনায় আনা হয়নি।
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আইসিসি কিংবা বিসিবি–কেউই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।
এদিকে, ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন জানিয়েছে, চারজন বাংলাদেশি আম্পায়ারকে তারা ভিসা দিয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, বিশ্বকাপ কাভারের জন্য কোনো সাংবাদিকের ভিসা আবেদন তারা পায়নি। ‘তাই ভিসা প্রত্যাখ্যানের প্রশ্নই ওঠে না,’ বলেন তিনি।
রাজনীতির শিকার খেলাধুলা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসনসহ নানা জটিল দ্বিপক্ষীয় ইস্যু রয়েছে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে খেলাধুলা এসব বিরোধের বাইরে ছিল।
সেই ব্যতিক্রমী অবস্থান এখন ভাঙতে বসেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। এক সাবেক কূটনীতিক বলেন, খেলাধুলা রাজনৈতিক ও বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হলে তা দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেক কূটনীতিক সতর্ক করে বলেন, শুরুতেই বিষয়টির সমাধান না হলে তা বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। ‘পানি বণ্টন বা নিরাপত্তার জটিলতা সবাই না বুঝলেও খেলাধুলা সবাই বোঝে। খেলাধুলা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেলে সাধারণ মানুষের মনোভাবের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে,’ যোগ করেন তিনি।


