নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার চতুর্থ দিনেও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি হেলিকপ্টারে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে দুর্গতদের। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
রোববার বিবিসির খবরে বলা হয় নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে । নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ।
চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আর নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা রোববার সকালে জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩৪ জন হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি।
নেপালে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
হেলিকপ্টারে নিরাপদ আশ্রয়ে দুর্গতরা

বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের নুওয়াকোট জেলায় হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে। কাপড়, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, বিস্কুট ও চালসহ বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী নিয়ে হেলিকপ্টারগুলো সেখানে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকা থেকে জীবিতদেরও নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হচ্ছে।
হেলিকপ্টার থেকে নামানো হচ্ছে আহত ও অসুস্থ মানুষদের। উদ্ধার হওয়া অনেকের পরনে থাকা পোশাক ছাড়া সঙ্গে আর কিছুই ছিল না। তাদের মধ্যে কয়েকটি শিশুকেও সেনাসদস্যরা কোলে করে বের করে আনেন। তাদের ত্রিশূলীর আশপাশের এলাকা থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানা যায়।
ধ্বংসস্তূপে ঘরে ফিরছেন বাসিন্দারা

ত্রিশূলী থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলার মধ্যেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে কোনোভাবে অবশিষ্ট জিনিসপত্র উদ্ধার করতে কিছু বাসিন্দা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরে ফিরে যাচ্ছেন।
তবে উদ্ধার সমন্বয়কারীরা গ্রামটির প্রবেশমুখ থেকে স্থানীয় বাসিন্দা, সাংবাদিক ও স্বেচ্ছাসেবকদের সরিয়ে দেন। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে উদ্ধারকারী দল। কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান শুরু হয়।
স্বজনদের অপেক্ষা, বাড়ছে হতাশা

রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রধান সরকারি হাসপাতালের সামনে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। কেউ তথ্যকেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করছেন, কেউ হাসপাতালের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো আহতদের তালিকায় পরিচিত মুখ খুঁজছেন। হাসপাতালের দেয়ালজুড়ে নিখোঁজ স্বজনদের ছবি, নাম ও যোগাযোগের নম্বরসংবলিত পোস্টার লাগানো হয়েছে।
নুওয়াকোটের একটি ত্রাণকেন্দ্রে সেনাসদস্যরা নিখোঁজ ও মৃতদের নামের তালিকা দেয়ালে টাঙিয়ে দিয়েছেন। স্বজনরা সেখানে ভিড় করে নাম খুঁজছেন, ছবি তুলছেন এবং কান্না সামলানোর চেষ্টা করছেন। উদ্ধারকারীরা হয়তো কোনো জায়গা থেকে তাদের স্বজনদের জীবিত উদ্ধার করবেন, এই আশাতেই অপেক্ষা করছেন তারা।
চলছে উদ্ধার অভিযান

কাদায় ঢাকা রাস্তায় এখনো দুর্যোগের চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও কাদায় আটকে আছে ট্রাক, কোথাও পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। নেপালের রাসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং চীনের গিরং সীমান্তচৌকিসহ বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত বলেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণস্থলের টানেলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে। সেখানে ঘন কাদার মধ্যে শতাধিক মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রাথমিক বন্যার পর পাহাড়ে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উদ্ধারকারীদের সতর্ক রাখা হয়েছিল। তবে চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির আকার এখন কমে এসেছে। চীনা সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালের সর্বোচ্চ অবস্থার তুলনায় শুক্রবার রাতে হ্রদটির পানির উচ্চতা ১০ মিটার কমে যায়।
শনিবার গিরং সীমান্তচৌকিতে চীনা উদ্ধারকারীদের পৌঁছানোর দৃশ্যও প্রচার করেছে সিসিটিভি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকারীদের ‘কেউ আছেন?’ বলে ডাকতে শোনা যায়। বন্যার সময় সীমান্তচৌকির ভবনে ঠিক কতজন ছিলেন, তা এখনো জানা যায়নি।
দুর্যোগকবলিত এলাকায় কাজ, পর্বতারোহণ কিংবা তীর্থযাত্রার জন্য যাওয়া বহু বিদেশিও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে নিখোঁজ ২৬১ জন বিদেশির মধ্যে ১০৪ জন নেপালের, ৪৯ জন ভারতের, ৩৩ জন লাটভিয়ার, ১৮ জন যুক্তরাষ্ট্রের এবং ১৫ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক। আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজদের খোঁজ, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনে দেশের সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি বর্তমানে সরকারের জাতীয় অগ্রাধিকার। তবে দুর্গম পাহাড়, উঁচু পর্বত এবং সরু গিরিখাতের কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
টানেলে উদ্ধারকাজ, জীবিত শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, দ্রুত ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা এবং মরদেহ সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত হিমায়িত ব্যবস্থা চেয়েছে নেপাল। ভারতের ১১ সদস্যের একটি টানেল উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে নেপালে কাজ শুরু করেছে। একই ধরনের একটি চীনা উদ্ধারকারী দলও শিগগির নেপালে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারত থেকে নেপাল এরই মধ্যে ৫৭ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী পেয়েছে। চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ সহায়তা পাঠাচ্ছে। পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের মূল্যায়ন অনুযায়ী আরও আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে নেপাল সরকার।


