গানের গলি: সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে সুরের সংস্কৃতি

গানের গলি: সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে সুরের সংস্কৃতি
ক্যাসেট, এলপি ও সিডির পুরোনো দোকানগুলো। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

দশকের পর দশক ধরে ঢাকার সংগীতপ্রেমীরা জানতেন, নতুন অ্যালবাম, দুর্লভ রেকর্ডিং এবং নতুন ব্যান্ডের গান খুঁজতে ঠিক কোথায় যেতে হবে।

এলিফ্যান্ট রোডের কাছেই একটি গলি গানের সঙ্গে এতোটাই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে, সেটি ‘গানের গলি’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে। একসময় এখানকার ক্যাসেট, এলপি ও সিডির দোকানগুলো ঢাকার সংগীত সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

বর্তমানে সেই দোকানগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র টিকে আছে।

পুরোনো সুরের সংগ্রহ। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

তারই একটি সুরবীণা। দোকানটির তাকজুড়ে এখনো পুরোনো ক্যাসেট ও সিডি রয়েছে, কিন্তু ক্রেতা প্রায় নেই বললেই চলে। এই দোকানের কাছেই ছিল রেইনবো, যেটি একসময় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যাসেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন ব্যান্ড ও সংগীতশিল্পীদের গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সুরবীণার মালিক মোহাম্মদ উজ্জ্বল চোখের সামনেই এই পরিবর্তন দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘একটা সময় ছিল, যখন এই জায়গাটা জমজমাট ছিল। এখন এমন দিনও যায়, যেদিন একটি ক্যাসেটও বিক্রি হয় না। যারা এখনো আসেন, তাদের বেশিরভাগই সংগ্রহকারী।’

তবুও উজ্জ্বল দোকানটি খোলা রাখেন। এই ব্যবসা এখন আর একটি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু তাকগুলোতে এমন কিছু রয়েছে যার মূল্য পণ্যের চেয়ে অনেক বেশি–আর তা হলো বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের খণ্ডচিত্র।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

এখানে রয়েছে হাজার হাজার ক্যাসেট, সিডি ও রেকর্ডে সংরক্ষিত গান, অ্যালবামের প্রচ্ছদ, লেবেল এবং স্ট্রিমিং যুগের অনেক আগের একটি সংগীতশিল্পের নানা নিদর্শন। এসব দিয়ে দোকানগুলো টিকবে কি না–এই প্রশ্নের বাইরেও আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে যে, মালিকেরা চলে গেলে এই সংগ্রহগুলোর কী হবে?

ক্যাসেট সংগ্রাহক মিলু আমান বহু বছর ধরে বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সংগীতের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন। তার কাছে এই সংগ্রহ শুধু গান শোনার বিষয় নয়—একটি নির্দিষ্ট সময়কে সংরক্ষণও। কিন্তু তার নিজের সংগ্রহের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি নিশ্চিত নন। তিনি জানেন না, তার পরে কেউ একই যত্ন ও আগ্রহ নিয়ে এই রেকর্ডিংগুলো সংরক্ষণ করবে কি না, নাকি একসময় সেগুলো ফেলে দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

তার এই উদ্বেগ একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতের ইতিহাসের একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আর্কাইভের বাইরে রয়েছে। এগুলো ছড়িয়ে আছে পুরোনো সংগীতের দোকান এবং কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহে। তারা হারিয়ে গেলে সেই ইতিহাসের কিছু অংশও তাদের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে।

একটি ক্যাসেট শুধু তার ফিতায় ধারণ করা গান নয়। এর প্রচ্ছদ, লেবেল, গানের তালিকা, শিল্পীর নাম, রেকর্ড কোম্পানি এবং প্রকাশ-সংক্রান্ত তথ্য—সবকিছুই বাংলাদেশের সংগীতশিল্প ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসের একটি গল্প বলতে পারে।

অন্যান্য দেশ ইতোমধ্যে সংরক্ষণ ও ডিজিটাইজেশনকে একসঙ্গে ব্যবহার করে এই সমস্যার মোকাবিলা শুরু করেছে।

Gaaner Goli
ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের বিশাল রেকর্ডেড সাউন্ড কালেকশনে ডিস্ক ও টেপ থেকে শুরু করে ক্যাসেট ও সিডি পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডিং রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ রেকর্ডিংগুলো উচ্চমানের ডিজিটাল ফরম্যাটে স্থানান্তর করা হয়, পাশাপাশি মূল উপকরণও সংরক্ষণ করা হয়। এই পদ্ধতি একটি সহজ বাস্তবতাকে স্বীকার করে: টেপ নষ্ট হয়ে যায়, সিডি অকেজো হতে পারে এবং পুরোনো ফরম্যাট চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও একসময় হারিয়ে যেতে পারে।

ইউনেস্কোও বিপন্ন অডিওভিজ্যুয়াল ঐতিহ্য ডিজিটাইজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সেখানে শুধু শব্দ সংরক্ষণ নয়, প্রতিটি রেকর্ডিং-সংক্রান্ত তথ্যও নথিভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশেও এই বিশাল সংগীত সংগ্রহ দিয়ে এখনই এমন একটি উদ্যোগ শুরু হতে পারে।

টিকে থাকা ক্যাসেটের দোকান ও ব্যক্তিগত সংগ্রহকারীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহগুলো তালিকাভুক্ত ও ডিজিটাইজ করা যেতে পারে। শিল্পী, অ্যালবাম, লেবেল, প্রকাশের তারিখ এবং মূল ফরম্যাটের তথ্য রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি নির্দিষ্ট জাতীয় সাউন্ড আর্কাইভ এই ধরনের সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।

আর এই জরুরি প্রয়োজনটি দিন দিন বাড়ছে। দোকানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সংগ্রহকারীরা বয়সে প্রবীণ হচ্ছেন। পুরোনো প্লেব্যাক মেশিন খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। আর একবার কোনো সংগ্রহ ফেলে দেওয়া হলে, সেটি পুনরুদ্ধার করা হয়তো আর সম্ভব হবে না।

ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/ টাইমস

বাংলাদেশে এখন সংগীত জগতে প্রবেশাধিকার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। প্রায় যেকোনো গানই মুহূর্তের মধ্যে স্ট্রিম করা যায়। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ কীভাবে সেই গান আবিষ্কার করেছে, কিনেছে, ভাগাভাগি করেছে এবং শুনেছে—সেই সংগীতের ভৌত ইতিহাসটি নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে।

উজ্জ্বল এখনো তার দোকান খোলেন। মিলু আমান এখনো তার সংগ্রহ আগলে রাখেন। কিন্তু তাদের পর কে এই কাজটি করবেন, তা তারা কেউই জানেন না।

শেষ সংগ্রহকারীরাও যখন আর থাকবেন না, তখন গানগুলো—আর সেই গানের সঙ্গে বয়ে চলা ইতিহাস—কে সংরক্ষণ করবে?

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad