ক্লাসরুম থেকে ফসলের মাঠে মধুপুরের মহিষমারা কলেজ

ক্লাসরুম থেকে ফসলের মাঠে মধুপুরের মহিষমারা কলেজ
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

মধুপুরের টিলাঘেরা এক নিভৃত কোণে অবস্থিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। টাঙ্গাইলের মহিষমারা কলেজে শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই–পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি কোদাল, নিড়ানি ও কাস্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি মাটি থেকে শিখছে জীবনের পাঠ।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি সাধারণ শিক্ষার সাথে বাস্তবমুখী কৃষি প্রশিক্ষণের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে, যা স্বাবলম্বী গ্র্যাজুয়েট তৈরির লক্ষ্যে একটি অনন্য ও অগ্রগামী মডেল হিসেবে রূপ নিয়েছে।

ছবি: টাইমস

এই বৈপ্লবিক উদ্যোগের নেপথ্য কারিগর দূরদর্শী কৃষক সানোয়ার হোসেন, যিনি ২০২২ সালে জাতীয় কৃষি পুরস্কার লাভ করেন। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে পৈতৃক জমি ও নিজের সম্পত্তি দান করে সানোয়ার এখন পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

টাঙ্গাইল শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে উর্বর লাল মাটি ও সবুজে ঘেরা মহিষমারা গ্রামটি আনারস, কলা, পেঁপে, আদা ও হলুদের জন্য বিখ্যাত। দীর্ঘ দিন ধরে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় যুবকরা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য হতো। সানোয়ার এই সংকট কাটাতে এগিয়ে আসেন এবং স্থানীয় একটি কেন্দ্র তৈরি করেন, যেখানে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা নিজেদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়েই শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।

ছবি: টাইমস

১৩৫ শতক জমির ওপর নির্মিত (যার ৯৫ শতক সানোয়ারের বাবা এবং ৪০ শতক সানোয়ার নিজে দান করেছেন) প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক নির্মিত স্থায়ী ভবনে ১৮ জন শিক্ষকের দিকনির্দেশনায় ৩০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

তবে মহিষমারা কলেজের আসল বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যবহারিক শিক্ষা কার্যক্রম। ২০১৮ সালে ক্যাম্পাসের ৪০ শতক জমিতে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের কেমিক্যালমুক্ত ফসল চাষ, চারাপোনা প্রস্তুত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো হয়। ক্লাসের বিরতি ও ছুটির দিনে শিক্ষার্থীরা সানন্দে মাঠে নেমে পড়ে এবং সানোয়ারের নির্দেশনা মেনে কাজ করে।

আরও পড়ুন

ছবি: টাইমস

কলেজের শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দলে ভাগ করা হয়েছে এবং তারা আনন্দের সঙ্গে কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করে।’ এই উদ্যোগের প্রভাব ক্যাম্পাসের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামেও। অনেক স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী এখন নিজ উদ্যোগে হোম গার্ডেন প্লট পরিচালনা করছে এবং পারিবারিক জমিতে নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করছে।

ড্রাগন ফল, মাল্টা থেকে শুরু করে কফি চাষ করে সফল কৃষি ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকতা ছেড়ে দেওয়া সানোয়ারের কাছে কৃষিকাজ একটি মর্যাদাপূর্ণ ও লাভজনক পথ। তার লক্ষ্য একটাই–নিশ্চিত করা যেন কোনো গ্র্যাজুয়েটকে বেকারত্বের মুখোমুখি হতে না হয়।

ছবি: টাইমস

নিজের জীবনের স্মৃতিচারণ করে সানোয়ার জানান, ১৯৯২ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর তিনি ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে সিলেটের একটি স্কুলে যোগ দেন। সাড়ে তিন বছর পর নিজের শেকড়ের টানে গ্রামে ফিরে এসে স্থানীয় একটি স্কুলে দুই বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কৃষির প্রতি প্রবল আবেগের কারণে শেষ পর্যন্ত স্থায়ী চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি কৃষিতে মনোনিবেশ করেন।

একটি সাধারণ কর্মদিবসে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে যখন ক্লাস চলছে, ঠিক তখন অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী উৎপাদনমুখী কৃষি কাজ করতে ব্যস্ত। শাকসবজির বীজ বোনার আগে মাটি প্রস্তুত করার কৌশল শেখাচ্ছেন সানোয়ার, আর শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে তা প্রয়োগ করছে।

ছবি: টাইমস

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ব্যবহারিক এই কাজের প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলে নেতিবাচক কোনো দাগ ফেলেনি। কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক জানান, ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯৮ জন কৃতকার্য হয়েছে, যার মধ্যে চারজন সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ পেয়েছে।

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বিশ্বাস করেন, মহিষমারা কলেজ শিক্ষা ও কৃষিভিত্তিক স্বাবলম্বিতার ক্ষেত্রে পুরো দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল তৈরি করছে।

টাঙ্গাইলের এই প্রাংশু প্রান্তরে শিক্ষার সূচনা শ্রেণিকক্ষে হলেও, তার প্রকৃত বিকাশ ও সাফল্য নিশ্চিত হচ্ছে ফসলের বিস্তৃত মাঠে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর