ফিলিস্তিনের গাজা যুদ্ধ নিয়ে মতপ্রকাশ করা কোনো শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। এতে বলা হয়, সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর গুরুত্ব বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং অন্য বিষয়ে সমালোচকদের অসাংবিধানিকভাবে চুপ করানোর চেষ্টা করছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অধীনে বিদেশি নাগরিকদের দেশ থেকে বিতাড়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এমনটি করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছে আদালত।
বার্তাসংস্থা এপির খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ফেডারেল আদালতের বিচারক নোয়েল ওয়াইজ স্থানীয় সময় শুক্রবার এ রায় দেন। ওই রায়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর পরিচালিত সংবাদপত্র ‘স্ট্যানফোর্ড ডেইলির’ পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়। গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্রটি জানিয়েছিল, বিতাড়নের আশঙ্কায় কিছু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন।
বিচারক নোয়েল তার রায়ে লিখেছেন, ‘আমরা যদি শুধু সরকার ও সরকারের নেতাদের প্রশংসাসূচক মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাই, তাহলে বাকস্বাধীনতা একটি “ভ্রম” ছাড়া আর কিছু নয়।’
ক্যালিফোর্নিয়া আদালতের এই সিদ্ধান্তটি প্রায় এক বছর আগে বোস্টনের এক মার্কিন জেলা আদালতের বিচারকের দেওয়া রায়ের সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, ‘ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করা এবং ইসরায়েলের সমালোচনা করার কারণে শুধু বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে বিতাড়নের উদ্যোগ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সংবিধান লঙ্ঘন করেছে।’
বিচারক নোয়েল বলেন, ‘বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী গণতন্ত্রের ভিত্তি। সরকারের বিতাড়নসংক্রান্ত কিছু বিধানে বাকস্বাধীনতা ও আইনের অস্পষ্টতার যে সমস্যা রয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ও পঞ্চম সংশোধনীর পরিপন্থী।’
এসব কারণে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের অনুসরণ করা ‘ডিপোর্টেশন রুলিংস’ (বিতাড়ন নীতির) কিছু অংশ বাতিল করেছেন।
সরকারের এই বিতাড়ন নীতি দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্পষ্টভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সরকার সুরক্ষিত মত প্রকাশের আদলে একটি ভীতিকর বার্তা দিয়েছে—ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কথা বলুন বা ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করুন, আমরা আপনার ভিসা বাতিল করব এবং আপনাকে বিতাড়িত করব। আচরণ ঠিক করুন।’
‘বিদেশি শিক্ষার্থীরা সেই সতর্কবার্তা শুনেছেন এবং তা মেনে নিয়েছেন। সেই নীরবতা খুবই স্পষ্ট’ উল্লেখ করে বিচারক নোয়েল বলেন, ‘স্ট্যানফোর্ড ডেইলিতে বৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিক কর্মীরা চাকরি ছেড়েছেন, প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছেন, দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, প্রকাশিত প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছেন এবং অভিবাসনসংক্রান্ত নেতিবাচক পরিণতির আশঙ্কায় নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার আবেদন করেছেন।’
বিদেশি নাগরিকদেরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সংশোধনীর অধীনে একই ধরনের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু তাদের এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে যেকোনো সময় এবং যেকোনো বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কী—তা অনুমান করতে হচ্ছে।’
‘এটি একটি অবোধ্য মানদণ্ড। সরকারকে পররাষ্ট্রনীতি ও অভিবাসন বিষয়ে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষকে অবশ্যই বুঝতে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে যে আইন কী অনুমোদন করে এবং কী নিষিদ্ধ করে। আমাদের সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতার অধিকার মানুষকে তাদের কথা, কাজ বা সমাবেশের মাধ্যমে এমন মত প্রকাশের অধিকার দেয়, যা অনেকের কাছে অপছন্দনীয় হতে পারে, প্রচলিত রাজনৈতিক ধ্যানধারণার বিপরীত হতে পারে অথবা দেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কার্যক্রম কিংবা যুদ্ধের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে’, যোগ করেন নোয়েল।
রায়ে তিনি ২০২৫ সালের মার্চে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন। ওই সময় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে মত প্রকাশকারী এবং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া জাতিসংঘের অধিনস্ত একটি সংস্থার বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান হামলা ও অভিযানকে ‘গণহত্যার পর্যায়ে’ পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’র সহপ্রতিষ্ঠাতা চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ডের পর তার সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের কথাও রায়ে উল্লেখ করেন বিচারক।
সান হোসের আদালতে বিচারক নোয়েল বলেন, ‘আগামীকাল, এমনকি আজও, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা যে কেউ সরকারের অপছন্দের মতামত প্রকাশ করার কারণে লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।’
‘এই অধোগতি আমাদের সংবিধানের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার স্বীকৃত। কোনো ব্যক্তির বক্তব্যের বিষয়বস্তুকে ঘৃণা করা এবং একই সঙ্গে সেই বক্তব্যের স্বাধীনতা রক্ষা করা দেশকে ভালোবাসা- দুটিই একসঙ্গে সম্ভব। বাকস্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা আমাদের দেশের শক্তিশালী নির্ভীকতার প্রকাশ’, যোগ করেন তিনি।
এদিকে রায়ের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে মার্কিন বিচার বিভাগ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
স্ট্যানফোর্ড ডেইলির প্রধান সম্পাদক জর্জ পোর্টিয়াস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের সংবাদকক্ষে কাজ করা প্রতিবেদকদের যেন কোনো প্রতিবেদন লেখার কারণে নিজেদের বিতাড়নের ভয় পেতে না হয়। আজকের বিজয়ের অর্থ হলো, তাদের আর সেই ভয় পেতে হবে না।’
মামলাটির বাদী ব্যক্তি অধিকার রক্ষাকারী সংগঠন ‘ফাউন্ডেশন ফর ইন্ডিভিজুয়াল রাইটস অ্যান্ড এক্সপ্রেশন’-এর আইনজীবী কনর ফিটজপ্যাট্রিক এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা শুধু তাদের জন্য নয়, যারা সরকারের সঙ্গে একমত হয়ে কথা বলেন। এই স্বাধীনতা সরকারবিরোধীদের জন্যও প্রযোজ্য।’


