হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজে ইরানি হামলার জবাবে দেশটির সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার ইরানের ড্রোন হামলার জবাবে এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এতে দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক ও শান্তি আলোচনা ভেঙে পড়ার শঙ্কা জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক ঠিকভাবেই মেনে চলেছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে চলেছে। সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি থাকলে তারা ফোনে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু হামলার জবাব হামলাই হবে।’
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, গত সপ্তাহে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দূরবর্তী পদ্ধতিতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে সই করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। এরপর দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনায় বসেছিলেন।
সেখানে দুই পক্ষই আলোচনায় অগ্রগতির ঘোষণা দিলেও শুক্রবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে একে অপরকে দায়ী করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অভিযানে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। পরে তারা একটি সাদাকালো ঝাপসা ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে একটি বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখিয়ে সেটিকে হামলার প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ওই ভিডিওর ক্যাপশনে জানান, অভিযান শেষ হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক এলাকায় একটি জেটির আশপাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এর জবাবে ইরানের নৌবাহিনী অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে কোন কোন মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, সে বিষয়ে তেহরান কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এক অজ্ঞাতনামা সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, সিরিক বন্দরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার পর সেখানে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। সূত্রটি জানায়, এই হামলার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগে হরমুজ প্রণালির নিয়ম ভঙ্গকারী কিছু জাহাজের দিকে সিরিক এলাকা থেকে কয়েক দফা সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়েছিল। পাশাপাশি কাছের কারপান এলাকা থেকে কৌশলগত এই জলপথের দিকে দুটি সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করা হয়।
পূর্ব হরমোজগান অঞ্চলের বন্দর প্রধানের বরাত দিয়ে শনিবার ইরানের মেহের বার্তা সংস্থা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সিরিক বন্দরের কোনো ক্ষতি হয়নি। বন্দরটি স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং স্থাপনা বা সরঞ্জামের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস এক বিবৃতিতে জানায়, মার্কিন হামলার জবাবে তাদের নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে আরও ব্যাপক জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকবে।
তারা অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দিক থেকে উসকানি দিয়ে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের চেষ্টা করেছে। তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে। আগ্রাসন পুনরাবৃত্তি হলে জবাব আরও বিস্তৃত হবে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেন, সবশেষ হামলার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করেছেন, তিনি আলোচনা কিংবা যুদ্ধবিরতির নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নন।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে লেখেন, ‘যুদ্ধবিরতির এই বেপরোয়া লঙ্ঘন শেষ পর্যন্ত সব সময়ের মতোই তাদের পিছু হটতে এবং অনুতপ্ত হতে বাধ্য করবে।’
তবে ইরানের দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
তেহরান এর আগে জানিয়েছিল, তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেবে। ওমান উপকূলের কাছে পণ্যবাহী জাহাজে বৃহস্পতিবারের হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোকেও তারা ওয়াশিংটনের পক্ষ না নিতে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে বলেন, তারা গত সপ্তাহের অন্তর্বর্তী চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানি বাহিনীর বাণিজ্যিক জাহাজে অযৌক্তিক হামলা স্পষ্টভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। ইরানি সামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলাকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আগের দিনের হামলার শক্ত জবাব বলে উল্লেখ করেছে সেন্টকম।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তারা সমন্বয় ও সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
চার মাস ধরে চলা ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাত অবসানের পথে অগ্রগতির ইঙ্গিতও মিলেছে। ইসরায়েল এবং লেবাননের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্রগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সংঘাত বন্ধে একটি চুক্তিতে সই করেছে।
দুই পক্ষই এই চুক্তিকে স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে। চুক্তির আওতায় হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র হবে এবং ইসরায়েল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা স্পষ্ট নয়। অবশ্য হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইসরায়েল সেনা সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত তারা এই চুক্তিতে সহযোগিতা করবে না।


