সুন্দরবনে পর্যটকবাহী জাহাজে ডাকাতির চেষ্টা শিরোনামে দেশের প্রথম সারি থেকে শুরু করে স্থানীয় অনেক সংবাদ মাধ্যমে যে প্রতিবেদন এসেছে, সেটি নাকচ করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ী, বন কর্মকর্তা ও কোস্ট গার্ড।
তারা বলছেন, নৌপথে ডাকাতের একটি দলকে বন রক্ষীদের তাড়া করার তথ্য সঠিক হলেও সেই দলটি পর্যটকবাহী জাহাজে আক্রমণ করেনি।
বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি কাউকে বক্তব্য না দিলেও তাকে ঊদ্ধৃত করা হয়েছে। আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি একটি সংবাদ মাধ্যমে বক্তব্য দিলেও অনেকগুলো সংবাদ মাধ্যমে তার বক্তব্য এসেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা এই ধরনের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পর্যটন মৌসুমের শুরুতে এই ধরনের খবর মানুষকে আতঙ্কিত করবে বলে মনে করছেন তারা।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করে যে, একটি বনদস্যু বাহিনীর সদস্যরা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে শনিবার রাত ৯টার দিকে কটকা খালের সাগর মোহনায় নোঙর করা ‘দি ওয়েভ-২’ জাহাজের দিকে এগোতে থাকে। সাগরে থাকা জেলেরা বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিক মোবাইল ফোনে বন বিভাগকে খবর দেন। বনরক্ষীরা নিজেদের বোট নিয়ে বনদস্যুদের ধাওয়া করে এবং তাদেরকে লক্ষ্য করে চার রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেন।
তবে সুন্দরবনে পর্যটন ব্যবসায়ীদের সমিতি ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস) বলছে, ভ্রমণের রুটিন অনুযায়ী বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্য এলাকায় শনিবার রাত ৯ টায় নোঙর করা ছিল পর্যটকবাহী জাহাজ ‘দি ওয়েভ-২’ ও ‘আরাল সি’।
সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ফরেস্টার তানভীর হাসান ইমরান টাইমসকে বলেন, ‘কোনো প্রকার যোগাযোগ বা বক্তব্য না নিয়েই আমার নাম ব্যবহার করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।’
সেদিন কী হয়েছিল, সেটি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাত ৯ টার দিক তার ফোনে এক জেলে কল দিয়ে জানান, কটকা হতে দূরে সাগরের দিকে থাকা জেলেরা একটি ডাকাত দলকে তাড়া করেছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার দল নিয়ে অস্ত্রসহ ট্রলারে করে রওনা দেন।
দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পরে কথিত ডাকাতদের ট্রলারটি দূর থেকে দেখা যায়।
‘ট্রলারটিকে থামতে লাইটের মাধ্যমে সংকেত দেই। কিন্তু তারা আমাদের দেখেই উল্টো সাগরের দিকে আরও জোড়ে ছুটতে থাকে। তখন আমরা চার রাউন্ড ফাঁকা গুলি করি এবং প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ধাওয়া করি। কিন্তু তাদেরকে ধরতে সক্ষম হইনি’, তানভীর হাসান বলেন।
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানোর পাশাপাশি কোস্টগার্ডকেও জানান এই বন রক্ষক। বলেন, ‘পরে দেখি নিউজ হয়েছে কটকায় পর্যটন জাহাজে ডাকাতের আক্রমণের চেষ্টা।’
বাগেরহাটে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা-ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরীও বলেন, ‘কটকায় যে ঘটনা ঘটেছিল তা কোনো জাহাজে ডাকাতির চেষ্টা না। ডাকাত দলের একটি খবর এসেছিল। আমাদের কটকা ক্যাম্প তখন তারা ডাকাতকে তাড়া করেছিল। এটিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।’
একটি মাত্র পত্রিকা ছাড়া কেউ তার সঙ্গে কথা না বললেও সবাই বক্তব্য কপি করেছে, বলেন তিনিও।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এমন একটি ঘটনা শোনার পর সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের টহল দল জাহাজের কাছে গিয়েছিল। কিন্তু ডাকাতির কোনো আলামত পাইনি। এমভি ওয়েভ-২ তে যারা ছিলেন, তাদের কেউও ডাকাতির কথা বলেনি।’
এসআরবি-৬ জানিয়েছে, ডাকাতি চেষ্টার কথা তারা সংবাদ মাধ্যম থেকে জেনেছে। তবে তাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি।
সুন্দরবনে পর্যটন ব্যবসায়ীদের সমিতি টোয়াস এমন খবরে হতবাক হয়েছে। তারা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, পর্যটন মৌসুমের শুরুতে এমন ভিত্তিহীন সংবাদ পর্যটনশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
টোয়াসের সিনিয়র সহসভাপতি ও এভারগ্রিন টুরস এর মালিক মাজহারুল ইসলাম কচি টাইমসকে বলেন, ‘সাংবাদিকদের উচিত যাচাই বাছাই করে সবার সঙ্গে কথা বলে সেটি উপস্থান করা। এমনটা হওয়া উচিত না যে, কেউ কিছু বলল না তার বক্তব্য নিয়ে কেউ ছাপিয়ে দিল। বস্তুনিষ্ঠ খবর ছাপানো হলে পর্যটন শিল্প আরও উন্নতি করবে।’


