ঢাকার আশুলিয়ায় পূর্বপরিচিত সম্পর্কের জেরে বিরোধের সূত্র ধরে এক দম্পতি ও তাদের সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এ ঘটনায় মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয় (৪৪) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন হৃদয়। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি।
বুধবার রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ।
এম এন মোর্শেদ জানান, গত ৫ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ৫৬ নম্বর কক্ষ থেকে পচা দুর্গন্ধ পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ তালাবদ্ধ কক্ষের দরজা খুলে ভেতরে অর্ধগলিত অবস্থায় এক পুরুষ, এক নারী ও নবজাতকের মরদেহ দেখতে পায়।
নিহতরা হলেন–আলমগীর কবির (৪৫), তার স্ত্রী নাজমা খাতুন (৩৯) এবং সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি নবজাতক। আলমগীরের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে। নাজমার বাড়িও একই উপজেলার বড় মাগুরা এলাকায়।
এ ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে ৬ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার পর থেকেই ঢাকা জেলা পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করা হয়। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, হৃদয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার ভাড়া বাসা থেকে নিহত নাজমার ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্স উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত ও আসামির জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। হৃদয় তরকারির ব্যবসা করতেন। আলমগীরের স্ত্রী নাজমার সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বিষয়টি জানতে পেরে আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তাকে নিজেদের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে পুরোনো সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে নাজমা হৃদয়কে ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করেন। পরে হৃদয়ও তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন।
পিবিআই জানায়, একপর্যায়ে হৃদয়ের দেওয়া ধাক্কা ও লাথিতে নাজমা পড়ে যান। এতে নাজমা ও তার গর্ভের সন্তান মারা যায় বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন হৃদয়।
এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে হৃদয় গামছা দিয়ে আলমগীরের গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর তিনজনের মরদেহ খাটের ওপর রেখে হৃদয় ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় তিনি নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্স নিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআই আরও জানায়, হৃদয়ের বিরুদ্ধে এর আগেও একটি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে আশুলিয়া থানায় দায়ের করা ওই মামলায় ২০২৩ সালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ পিপিএম বলেন, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই রহস্য উদঘাটনে ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। ভুক্তভোগীদের পূর্বপরিচিত ব্যক্তি, সম্পর্ক ও চলাফেরা যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে আসামিকে গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


