যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে ফের সতর্ক করে বলেছেন, মঙ্গলবার রাতের মধ্যে ওয়াশিংটনের শর্তে সমঝোতায় না পৌঁছালে ইরানকে ‘এক রাতেই ধ্বংস করে দেওয়া’ সম্ভব। যদিও তার এমন হুমকি নেহাত ‘মনগড়া’ আর ‘ভিত্তিহীন’ বলেই মনে করছে তেহরান।
ইরান এখন ৪৫ দিনের নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায়। সেইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিও প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির নেতারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সোমবার পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তেহরান জানিয়েছে, ‘শুধুমাত্র স্থায়ী শান্তিই গ্রহণযোগ্য। এর চেয়ে কম কোনো কিছু মানা হবে না।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা ১০ দফা প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচলের নির্দেশিকা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানসহ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের দেওয়া প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির পর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ওয়াশিংটন-তেলআবিব ও তেহরানের মধ্যে একটি বিস্তৃত শান্তিচুক্তির আলোচনা শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরানকে তার দেওয়া শর্ত মেনে নিতে মঙ্গলবার পর্যন্ত ঘোষিত সময়সীমাই বহাল রাখেন।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে “এক রাতেই” ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব এবং সেই রাত হয়তো মঙ্গলবারই হতে পারে।’
ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ধ্বংসের হুমকি দিয়ে এসব হামলা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে- এমন উদ্বেগও উড়িয়ে দেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘সমঝোতা না হলে বুধবার ভোরের মধ্যে ইরানের প্রতিটি সেতু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সব বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।’

এর জবাবে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে ‘মনগড়া, অহংকারী ও ভিত্তিহীন হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দেন।
দেশটির শিল্পী ও ক্রীড়াবিদদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে মানববন্ধনের আহ্বান জানিয়ে উপ-ক্রীড়া মন্ত্রী আলিরেজা রাহিমি বলেন, ‘জনগণের অবকাঠামোর ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধ- বিশ্বকে এ বার্তা দিতে আমরা একসঙ্গে দাঁড়াব।’
জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ট্রাম্পের পোস্ট সরাসরি সন্ত্রাসবাদে উসকানি এবং যুদ্ধাপরাধের স্পষ্ট ইঙ্গিত।’
দেশটির স্বাধীন বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের জনগণ ‘স্বাধীনতার জন্য এই কষ্ট মেনে নিতে প্রস্তুত’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা এমন বার্তাই পাঠিয়েছেন।
এদিকে সোমবার রাতভর মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানে অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের হামলায় ইসরায়েলের হাইফা শহরে নিহত হয়েছেন চারজন।

সোমবার ভোরে তেহরানে শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানায় ইরানের সংবাদ সংস্থা ওয়ানা।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেন, এই হামলার জবাবে ‘শত্রুরা ইরানের প্রকৃত শক্তি দেখতে পাবে’। সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরানের প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়। একই সময়ে লেবাননের ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও ফের যুদ্ধ শুরু করেছে ইসরায়েল।
জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানায়, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে তিন হাজার ৫৪৬ জন এবং লেবাননে প্রায় এক হাজার ৫০০ জন নিহত হয়েছেন।


