হাতে পিস্তল নিয়ে তথাকথিত মাদকসেবীদের পেছনে ধাওয়া করা কোনো ভালো সরকারের কাজ হতে পারে না। এটাকে বলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। সরকারি দলের এক নেতা কতটা বেপরোয়া হলে নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভেবে এমন কাজ করতে পারেন, এটি তারই এক চরম নমুনা।
শনিবার রাজধানীতে একটি রাজনৈতিক নাটক সাজান তিনি। সঙ্গে ছিল তার সশস্ত্র নিরাপত্তাবাহিনী। এমনকি তাদের একজনের হাতে একটি বড় ও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা গেছে, যা সাধারণ মানুষের রাখা একদম নিষিদ্ধ। এই নেতার নাম ইশরাক হোসেন।
তিনি তারেক রহমানের সরকারের একজন সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী। সাধারণ মানুষকে তাড়া করতে তিনি প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। এরপর সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য সেই ভিডিও নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্টও করেন। এটি কোনো জনসেবা নয়, বরং খোলাখুলি আইন না মানার বাহাদুরি।
আমরা একটি সংবিধান, নিজস্ব আইন ও পুলিশ-প্রশাসনের অধীনে বাস করি। দেশের একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য যখন এভাবে প্রকাশ্যে আইন ভাঙেন, তখন তিনি আসলে আইনের শাসনকেই চরম অপমান করেন। পিস্তলটি যদি তার নিজেরও হয়ে থাকে, তবুও তিনি অস্ত্রের লাইসেন্সের নিয়ম ভেঙেছেন বলে মনে হয়। (অস্ত্রটি তার নামে লাইসেন্স করা কি না, তা আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় তিনি কিন্তু কোনো অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেননি।)
এই ঘটনার সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো তার দম্ভ ও অহংকার। রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে তিনি আইন, প্রশাসন কিংবা পুলিশ—কাউকে তোয়াক্কাই করলেন না। নিজেকে খুব প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর হিসেবে জাহির করতেই তিনি এই নাটকটি করেছেন। তিনি হয়তো ভেবেছেন—দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, সরকার বা প্রধানমন্ত্রী কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন না। যারা দেশের আইন বানান, তারা নিজেরাই যখন আইন অমান্য করেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে খুব ভুল একটি বার্তা যায়। একদম ওপরের পর্যায়ে যদি বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি পেয়ে বসে, তবে দেশের পুরো নিয়ম-কানুন ও জবাবদিহিতাই ভেঙে পড়তে শুরু করে।
তার দ্বিতীয় অপরাধটি হলো—প্রথম ভুলটি ঢাকার চেষ্টা করা। তিনি দাবি করছেন, নিজের আত্মরক্ষার্থেই নাকি তিনি এমনটি করেছেন। কিন্তু সব প্রমাণ তার এই দাবির উল্টো কথা বলছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ঘটনাটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। তিনি নিজেই ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়ে লেখেন—পুলিশ ব্যর্থ হওয়াতেই নাকি তাকে বাধ্য হয়ে এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে! কিন্তু একজন মানুষ যখন সত্যি সত্যিই আত্মরক্ষার জন্য কিছু করে, তখন সে নিশ্চয়ই সেটার প্রচারণামূলক ভিডিও বানিয়ে পোস্ট করে না। আর নিজের জীবন নিয়ে যিনি ভয় পান, তিনি অন্তত পুলিশের ব্যর্থতার অজুহাত দেন না।
কোন সময়ে তিনি কাজটি করলেন—সেটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দিন হিসেবে বেছে নিলেন এমন একটি সময়, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে হুট করে শহরের বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শনে বের হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের প্রশংসা ও সুনাম কুড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই ইশরাকের এই বেপরোয়া কাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর সেই ভালো উদ্যোগটির ওপর জল ঢেলে দিল।
একজন সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু তিনি মনে হয় নিজের পদ ও ক্ষমতার সীমা ভুলে গেছেন।
যেকোনো বিচারেই তিনি একটি অপরাধ করেছেন। দেশের আর দশটা সাধারণ নাগরিকের মতো তার বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইনে সঠিক বিচার হওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রীর উচিত হবে না তার দলের কোনো সহকর্মীকে এভাবে যা খুশি তা করার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই ধরনের বিপজ্জনক আচরণের সামনে চুপ থাকা বা ছাড় দেওয়া প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষা করবে না; বরং এটি তার নিজের ভাবমূর্তিও নষ্ট করবে এবং এর খেসারত দিতে হবে বিএনপিকে।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ


