প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান বাড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পরামর্শক কমিটির এক হাজার পৃষ্ঠার সুপারিশ বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেই।
মাসুদ রহমান পেশায় চিকিৎসক। বেড়ে উঠেছেন ঢাকার নিকটবর্তী এক শহরে। সন্তানকে ভর্তি করেছেন আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুলে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া ঘন ঘন পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের শিখনপ্রক্রিয়া এবং মানস-গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কোনো সচেতন অভিভাবকই তার সন্তানের শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইবে না।’
বাংলা মাধ্যমে সন্তানদেরকে পড়াচ্ছেন, এমন বেশ কয়েকজন অভিভাবক চরম বিরক্ত। তারা বলছেন, পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের নামে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তারা তাদের মতো করে প্রতিবছর ইতিহাস সংক্রান্ত কিছু বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে। ফলে শিক্ষার্থীরাও বিভ্রান্ত হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য যেসব পরিবর্তন প্রয়োজন, সেসব পরিবর্তনে কোনো সরকারই অগ্রাধিকার দেয়নি।
এই কমিটির প্রধান ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশ-এর কাছে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার কাজে সত্যিকারের শিক্ষাবিদদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের কথা কোনো সরকারই শোনে না। আমলা আর মন্ত্রী-উপদেষ্টারা মিলে নিজেদের ইচ্ছামতো সবকিছু চাপিয়ে দেন। যার ফলে সার্বিকভাবে শিক্ষায় আসলে কোনো পরিবর্তন আসে না।’
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন দরকার। সেই কমিশন গবেষণা করবে, সময়ের চাহিদা আর ভবিষ্যতের রূপরেখা ঠিক করে একটি শিক্ষানীতি তৈরি করবে। সেই শিক্ষানীতির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হবে শিক্ষাক্রম, আর তার আলোকেই সাজানো হবে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু।
বাংলাদেশে এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিবছর শুধু শেষের ধাপটি, অর্থাৎ ‘পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু’ পরিবর্তন করা হয়। এতে করে পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় একটি হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, শিক্ষাবিদদের তাত্ত্বিক কথা শুনে দেশ স্বাধীন হতো না, আর তাদের কথা শুনে শিক্ষাব্যবস্থাও চালানো যাবে না।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জানান, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাক্রমকে সময়ের উপযোগী করতে কয়েক বছর পর পর কিছু পরিমার্জন আনা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কেবল রাজনৈতিক ইতিহাস পরিবর্তন করা ছাড়া পাঠ্যবইয়ে আর কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয় না। এর ফলে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলানো তো সম্ভবই হচ্ছে না, উল্টো দেশের সঠিক ইতিহাস নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষানীতি কোনো সরকারই তৈরি করেনি, এখনো কেউ কিছু করছে না। এভাবে চললে শিক্ষার জাতীয় দর্শন কীভাবে তৈরি হবে?’
শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের নামে কী হচ্ছে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা প্রথম সারিতে ছিলেন। পরবর্তী সরকারেও শিক্ষার্থীদের দুইজন প্রতিনিধি যুক্ত হন। এই সরকার অন্যান্য অনেক খাত সংস্কারের জন্য নানা কমিশন গঠন করলেও শিক্ষা খাত নিয়ে কোনো কমিশন তৈরি করেনি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের দাবির মুখে একপর্যায়ে শিক্ষার মান বাড়াতে দুটি পরামর্শক কমিটি করা হয়। তবে তাদের দেওয়া সুপারিশগুলো পরবর্তীতে আর আলোর মুখ দেখেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল-এর পরিচালক অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো সুনির্দিষ্ট ম্যাপিং নেই। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে চাকরির বাজারের যে সম্পর্ক, তা নিয়েও কোনো বিশ্লেষণ নেই। এসব জায়গায় অনেক বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।’
নতুন শিক্ষাক্রম তৈরিতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেটিরও কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু অংশ রদবদল করা হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-পূর্ব আলোচনায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি তোলেন। তখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, তারা নিয়মিত সবার সঙ্গে আলোচনা করেই কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতেও সবার পরামর্শ নিয়ে কাজ করবেন। এভাবে মূলত শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকার এড়িয়ে যায়।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, এবার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নতুন চারটি বই যুক্ত হচ্ছে। যারা বইগুলো তৈরি করছেন তারা সবাই বিশেষজ্ঞ এবং কোনো না কোনোভাবে শিক্ষাক্রমের সঙ্গেই এসব বই যুক্ত আছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানাচ্ছে, শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়ে প্রস্তাব তৈরি করা এবং ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য নিজ দলীয় ভাবাদর্শের কয়েকজন অধ্যাপককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। কিন্তু তাদের মধ্যে দুজন অধ্যাপক ইতিমধ্যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়ে চলে গেছেন। এরপর সেই বিষয়টি আর এগোয়নি।
শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করে ২০২৮ সালের মধ্যে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশ করার কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ টাইমসকে বলেন, এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন।
অন্যদিকে এনসিটিবির সদস্য মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদির টাইমসকে বলেন, যে কাজটি এখনো শুরুই হয়নি, তা নিয়ে মন্তব্য করা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাজ হতে পারে না।
কেন এত জটিলতা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছোট পরিসরে শিক্ষাক্রম পরিমার্জনের কাজের সঙ্গে যুক্ত এনসিটিবির এক সাবেক কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, যাদের ওপর শিক্ষা দর্শন ও শিক্ষা কমিশন নিয়ে প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা একপর্যায়ে বিষয়টিকে জটিল বলে আর কাজ এগোতে চাননি। প্রকৃতপক্ষে তারা এই বিষয়গুলো বোঝেনই না। অথচ যারা বোঝেন তাদেরকে এসব দায়িত্ব দেওয়া হয় না।
একটি শিক্ষাক্রম তৈরি করার সময় মূলত চারটি ধাপের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়: শিক্ষার্থীদের তথ্যভিত্তিক জ্ঞান দেওয়া; যেন তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সেই জ্ঞান বা তথ্য ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করা; কোনো কাজ করা বা না করার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করা, যাতে তারা ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে এবং নিজের ইচ্ছায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে গবেষণার রূপরেখা তৈরি করতে হয়, সর্বস্তরের মানুষের মতামত নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পরিবেশে তা পরীক্ষা বা পাইলটিং করে দেখতে হয়। এরপর পরিস্থিতি ও প্রয়োজন বিবেচনা করে শিক্ষাক্রমের একটি খসড়া তৈরি হয়।
এরপর প্রতিটি শ্রেণির পড়ালেখার সঙ্গে অন্য অধ্যায়ের পড়ালেখার মিল রেখে পাঠ্যক্রম সাজাতে হয়। এমনকি প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এক শ্রেণির পড়ার সঙ্গে অন্য শ্রেণির পড়ার সমন্বয় রেখে পুরো শিক্ষাক্রমের একটি কাঠামো তৈরি করতে হয়। এরপর সেই অনুযায়ী বিষয়বস্তু বসাতে হয়।
এই বিশাল কাজে শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও প্রতিটি ধাপে যুক্ত করা খুব জরুরি। তা না হলে যেকোনো ভালো শিক্ষাক্রমও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
শিক্ষাবিদ কামরুল হাসান মামুন বলেন, একটি জাতির অবশ্যই নিজস্ব শিক্ষা দর্শন থাকতে হয় এবং তার জন্য সুনির্দিষ্ট একটি শিক্ষাক্রম দরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সেই শিক্ষা দর্শনের প্রয়োগ শুরু হয়। তাই প্রাথমিকে পাঠ্যপুস্তক খুব গুরুত্বপূর্ণ। পড়ালেখার পাশাপাশি আদব-কায়দা, সামাজিক আচরণ, দেশপ্রেম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য—সবকিছুর শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই দিতে হয়।
তার মতে, যখন যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের অনুগত বা নিজস্ব মতাদর্শের মানুষদের দিয়ে শিক্ষা খাতে পরিবর্তন আনে। পরবর্তীতে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। অথচ এই কাজ রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে নিরপেক্ষ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে করা উচিত।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা ‘শিক্ষা অধিকার সংসদ’-এর সদস্যসচিব ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সরকার শিক্ষার পেছনে অনেক টাকা খরচ করছে। কিন্তু নাগরিকদের কাছে রাষ্ট্র আসলে কী চায়, সেই লক্ষ্য পরিষ্কার করার জন্য সঠিক শিক্ষানীতি এবং তাতে সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকা উচিত। তা না করে হুটহাট ইচ্ছামতো বইয়ের বিষয়বস্তু বদলে দিলে পরবর্তীতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবার জন্যই জটিলতা তৈরি হয়।


