রংপুর। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বাড়ি। একারণে ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি। নব্বইয়ের উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন এরশাদ। কারাগারে থেকেই ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে রংপুর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে অংশ নিয়ে সবগুলোতে জয়ী হয়েছিলেন তিনি।
সেই ১৯৮৬ সাল থেকে রংপুরে জাতীয় পার্টির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। এই দুই দলের ধারেকাছেও ছিলনা বিএনপি। বরং জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতেই জাতীয় পার্টি-আওয়ামী লীগের পরে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান। সবেধন একটি আসনে বিএনপির প্রার্থী তার নিজস্ব প্রভাবে জামায়াতের চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিলেন। বাকি আসনটিতে সমানে সমান বিএনপি-জামায়াত।
গঙ্গাচড়া উপজেলা ও বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের একাংশ নিয়ে রংপুর-১ আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৫০ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন এরশাদ। তার বিপরীতে ১৫ হাজার ৫১৫ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল জামায়াত। বিএনপি প্রার্থীর ভোট ছিল মাত্র ৬৯৫। পরের বার ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তৃতীয় স্থানে থাকা জামায়াতের ভোট ছিল ২১.৪ শতাংশ, আর বিএনপি পেয়েছিল মাত্র তিন শতাংশ ভোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের সঙ্গী জামায়াতকে আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। জোটসঙ্গী হিসাবে আওয়ামী লীগকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে ওঠে এসেছিল জামায়াত। তাদের প্রার্থী পেয়েছিল ২৮.২ শতাংশ ভোট। পরের নির্বাচনেও জামায়াত থেকে ছিল চারদলীয় জোটের প্রার্থী।
বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে রংপুর-২ আসনের চিত্রও অনেকটা একই রকম। ১৯৯১ সালে প্রায় সাত শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল জামায়াত, আর বিএনপি পেয়েছিল দুই শতাংশ ভোট। ১৯৯৬ সালে ভোটের খুব একটা হেরফের হয়নি। জামায়াতের প্রায় ছয় শতাংশ ভোটের বিপরীতে বিএনপির ভোট ছিল প্রায় তিন শতাংশ। ২০০১ সালে যথারীতি জোটসঙ্গী হিসাবে জামায়াতকে এই আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। সেবার জামায়াতের ভোট ছিল ৯.৪ শতাংশ।
সদর উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের বাকি এলাকা নিয়ে রংপুর-৩। শহরের এই অংশে এরশাদের বাড়ি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসনে জামায়াত ও বিএনপির ভোট ছিল প্রায় সমান। বিএনপি ভোট ছিল ৪.৭ শতাংশ, অন্যদিকে জামায়াতের ছিল ৪.৬ শতাংশ ভোট। ১৯৯৬ সালে খানিকটা এগিয়ে যায় জামায়াত, তারা পেয়েছিল ৫.২ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে বিএনপির ভোট ছিল চার শতাংশ। পরের বার ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোটের মনোনয়ন পাওয়া বিএনপি প্রার্থী হাবিব উন নবী সোহেল পেয়েছিলেন প্রায় ১১ শতাংশ ভোট।
কাউনিয়া ও পীরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে রংপুর-৪। অন্য আসনগুলোর চেয়ে এখানকার সমীকরণ কিছুটা ভিন্ন। এখানে দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টি আর বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আপন দুই ভাই করিম উদ্দিন ভরসা ও রহিম উদ্দিন ভরসা। সমাজসেবার কারণে এই দুই ব্যবসায়ীর পারিবারিক ভোটব্যাংক বেশ ভাল। ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন রহিম উদ্দিন ভরসা, ১৩.২ শতাংশ ভোট নিয়ে আওয়ামী লীগের পেছনে থেকে হয়েছিলেন তৃতীয়। তবে জামায়াতও পেয়েছিল তার প্রায় সমান ১৩ শতাংশ ভোট। সেবার নির্বাচন করেননি করিম উদ্দিন ভরসা। তবে পরের বার ১৯৯৬ সালে দুই ভাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সহজেই নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির করিম উদ্দিন ভরসা। আর ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন বিএনপির রহিম উদ্দিন ভরসা। জামায়াতের ভোট ছিল আগের মতই ১৩ শতাংশ। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের মনোনয়নে জামায়াতের ভোট যোগ করে রহিম উদ্দিন ভরসা পেয়েছিলেন ৩৪.২ শতাংশ ভোট, প্রথমবারের মত দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তিনি। নির্বাচিত হন তার ভাই জাতীয় পার্টির করিম উদ্দিন ভরসা। ২০০৮ সালে অবশ্য জাতীয় পার্টির কাছ থেকে আসনটি ছিনিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ।
মিঠাপুকুর উপজেলা নিয়ে রংপুর-৫ আসনে ১৯৯১ সালে তৃতীয় স্থানের জামায়াতের ভোট ছিল ১৮ শতাংশ। তার চেয়ে অনেক পেছনে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র ২.২ শতাংশ ভোট। ১৯৯৬ সালে জামায়াতের ভোট কমে দাঁড়ায় ১৪.৫ শতাংশে, অন্যদিকে বিএনপির ভোট ছিল দুই শতাংশ। ২০০১ সালে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিকে(নাজিউর) আসনটি ছেড়ে দেয় চারদলীয় জোট।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে আসন রংপুর-৬। এখানে ১৯৯১ সালে ১১ শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল জামায়াত, আর মাত্র তিন শতাংশ ভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। সেবার বিজয়ী জাতীয় পার্টির এরশাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ৩২৫ ভোট। ১৯৯৬ সালে জামায়াতকে হটিয়ে ৭.৮ শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেন বিএনপির নতুন প্রার্থী। আর জামায়াতের ভোট ছিল ৬.৫ শতাংশ। এই আসনে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনাকে হারিয়ে দেন জাতীয় পার্টির নূর মোহাম্মদ মণ্ডল।
আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। জাতীয় পার্টি নির্বাচন করার কথা জানালেও তাদের কোনো প্রার্থী মাঠে নেই। তাই আপাতত লড়াই এখন তৃতীয় স্থানের জামায়াতের সঙ্গে চতুর্থ স্থানের বিএনপির। বেশ কয়েকটি সাম্প্রতিক জরীপে রংপুর বিভাগে জামায়াতের ভোট বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি অবাধে নির্বাচনের সুযোগ পেলে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবে জামায়াতে ইসলামী।


