ষাটের দশক—বাংলাদেশ তখনও পূর্ব পাকিস্তান। বাঙালি অধ্যুষিত এই অংশের সংস্কৃতির ওপর রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চাইলে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের সরকার। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের চেষ্টা চলছে, বাংলা বর্ণমালায় ‘হিন্দুয়ানি ছাপ’ মুছে ফেলার দাবি উঠছে।
ঠিক সেই সময় জহির রায়হান দাঁড়ালেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে। ১৯৬৬ সালে নির্মাণ করলেন বেহুলা নামে চলচ্চিত্র। যা লোককাহিনির গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠল বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ঘোষণা।
২৮ অক্টোবর চলচ্চিত্রটির মুক্তির ৫৯ বছর পূর্ণ হলো। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটি কেবল এক ক্লাসিক নয়, এক সাংস্কৃতিক দলিল।
লোকপুরাণ থেকে জাতীয় চেতনা
‘বেহুলা’র কাহিনিতে এসেছে বাংলা সাহিত্যের অমর মহাকাব্য মনসামঙ্গল থেকে। যেখানে মানুষের সংগ্রাম, ভালোবাসা, আর নিয়তির বিরুদ্ধে লড়াই জেগে ওঠে পুরাণের আখ্যানের মধ্য দিয়ে। মনসা দেবী পূজা দাবি করেন; চাঁদ সওদাগর অস্বীকার করলে ক্রুদ্ধ দেবী তার সন্তানদের মৃত্যু ডেকে আনেন। শেষ পর্যন্ত নববধূ বেহুলা ভেলায় চড়ে যাত্রা করেন দেবতার রাজ্যে গিয়ে স্বামীর প্রাণ ফেরানোর অভিযানে।
জহির রায়হান এই পৌরাণিক কাহিনিকে পরিণত করেন মানবিক মহাকাব্যে। তার ক্যামেরা দেবতার অলৌকিকতায় নয়, মানুষের সাহস ও ভালোবাসায় আলোকপাত করে। এখানে বেহুলা দেবী নন; একজন নারী, যিনি ভাগ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, অন্যায়ের মুখে নীরব থাকেন না।
চলচ্চিত্রের শুরুতেই লেখা ছিল, ‘পদ্মাপুরাণ প্রকৃত মানুষেরই কাব্য।’
এই এক বাক্যেই ধরা আছে ছবির দর্শন। আর সেটি হলো–মানুষই এখানে কেন্দ্র, দেবতা নয়।
সংস্কৃতির প্রতিবাদের ভাষা
তৎকালীন ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্প উর্দুভাষার প্রভাবের চাপে ছিল। প্রযোজকেরা পশ্চিম পাকিস্তানের বাজার ধরতে উর্দু সিনেমা বানাতেন। এমন সময়ে জহির রায়হান নির্মাণ করলেন সম্পূর্ণ বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র। যার ভাষা, সংগীত, সুর ও চিত্রভাষা ছিল এই মাটির গন্ধে ভরা।
আলতাফ মাহমুদের সুরে ছবিটি হয়ে ওঠে লোকসঙ্গীতের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। পাঁচালি, কীর্তন, বিয়ের গান, শোকগাঁথা—সব একসঙ্গে বাঙালির সংস্কৃতির এক পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ। এই ছবির মধ্য দিয়েই যেন জহির রায়হান ঘোষণা করেন, আমাদের শক্তি আমাদের মাটির গল্পে, আমাদের নিজস্ব পুরাণে।
রাষ্ট্র যখন বাঙালিত্ব মুছে দিতে চাইছিল, তখন মনসামঙ্গল, এক ‘হিন্দু পুরাণ’ অবলম্বনে করা চলচ্চিত্র ছিল নিঃশব্দে উচ্চারিত এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ।
চরিত্র ও প্রতীক
‘বেহুলা’ নারী শক্তির প্রতীক। তিনি সতী নন, প্রতিরোধী নারী। রাজগণক তার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘সে বিদ্যায় সরস্বতী, বুদ্ধিতে দ্রৌপদী, চরিত্রে সাবিত্রী, কর্মে দুর্গা।’
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে যখন বেহুলা বলে, ‘স্বামী যদি বিশ্বাস না রাখে, তবে সতীত্বের মানে কী?’
আর এই একটি সংলাপই পুরো চলচ্চিত্রে নারী দর্শনকে সংজ্ঞায়িত করে।
বেহুলার ভেলায় যাত্রা আসলে এক জাতির যাত্রা, পরাধীনতা থেকে মুক্তির পথে। মৃত লখিন্দরের পুনর্জীবন বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণের রূপক হয়ে ওঠে।
মনসা দেবী, চাঁদ সওদাগর, বিশু মিস্ত্রি, কমলি—সবাই মিলে মানুষের সমাজ, বিশ্বাস আর ব্যঙ্গকে নানা স্তরে তুলে ধরে। বিশু-কমলির সংলাপে যেমন হাস্যরস, তেমনি আছে পুরুষতন্ত্র ও সামাজিক বৈষম্যের তির্যক মন্তব্য।
অভিনয় ও নির্মাণ
চলচ্চিত্রের প্রাণ ছিলেন সুচন্দা। তার চোখের ভাষা, সংলাপের দৃঢ়তা ও বেদনাভরা মুখাবয়ব বেহুলাকে পৌরাণিক নারী থেকে বাস্তব সংগ্রামী নারীতে রূপ দেয়। লখিন্দরের চরিত্রে রাজ্জাক ছিলেন সংযত, স্থির; এক অর্থে পুরুষতন্ত্রের নীরব প্রতীক। মনসা চরিত্রে সুমিতা দেবী, চাঁদ সওদাগরে ফতেহ লোহানী, শাহী সওদাগরে মোহাম্মদ জাকারিয়া—সবাই ভারসাম্যপূর্ণ অভিনয়ে ছবিটিকে পূর্ণতা দিয়েছেন।
জহির রায়হানের পরিচালনা এখানে এক কথায় অসাধারণ। সীমিত প্রযুক্তি সত্ত্বেও তিনি নদীপথের দৃশ্য, ভেলার যাত্রা আর ইন্দ্রপুরীর সভাকে এমনভাবে ফুটিয়েছেন যে, প্রতিটি ফ্রেম আজও নন্দনতত্ত্বের পাঠ হিসেবে দেখা যায়।
সঙ্গীত ও নন্দনবোধ
আলতাফ মাহমুদের সংগীত ছিল ‘বেহুলা’র আত্মা। তিনি লোকসুরের ভেতর থেকে বেছে নিয়েছেন এমন রাগ ও তাল, যা গল্পের মর্মের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। শাহনাজ বেগম, নীনা খান, ঝরনা বন্দ্যোপাধ্যায়, মৌসুমি কবীর, নাজমুল হুদা ও মাহমুদুন্নবীর কণ্ঠে গানগুলো আজও সময়কে অতিক্রম করে টিকে আছে।
জাতীয়তাবোধের শিকড়
১৯৬৬ সালে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা ঘোষণা রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠছিল, তখন বেহুলা তার সাংস্কৃতিক প্রতিধ্বনি। একদিকে ছয় দফা ছিল মুক্তির রাজনৈতিক সনদ, অন্যদিকে বেহুলা ছিল সেই মুক্তির সাংস্কৃতিক ঘোষণা।
বেহুলার সংগ্রাম, তার অদম্য যাত্রা; সবই প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় বাঙালির আত্মমর্যাদা ও পরিচয়ের লড়াইয়ের। জহির রায়হানের বেহুলা তাই কেবল পুরাণনির্ভর সিনেমা নয়, এক জাতির জাগরণের ইতিহাস।


