‘ভাতের হোটেলে’ নেতাদের আটকে রাখা হয় ছয়দিন’

‘ভাতের হোটেলে’ নেতাদের আটকে রাখা হয় ছয়দিন’
‘বিদ্রোহ আজ, বিদ্রোহ চারিদিকে’...জুলাই অভ্যুত্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন অকুতোভয় ছাত্র-জনতা। ছবি: অনিক রহমান/টাইমস
Advertisement
Advertisement

‘ডিবির (গোয়েন্দা পুলিশ) রমনা জোনের এডিসি ফজলে এলাহী আমাদের কেবিনে আর ডিবির আরেক কর্মকর্তা নাহিদ ইসলামের কেবিনে যান। আমরা বলেছিলাম, এখান থেকে গেলে আমরা সবাই একসঙ্গে যাব। পরে নাহিদ ভাইকে নিচে নামানো হলে আমরাও গেলাম। চিকিৎসা শেষ না হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের রিলিজ দিতে চাইছিল না। কিন্তু গোয়েন্দারা চাপ দিয়ে রিলিজ করিয়ে নিল। ইমপালস হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলা হলেও তারা আমাদের নিয়ে গেল মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে। তখন বুঝতে পারলাম ডিবির লোকেরা আমাদের ধরে এনেছে। তাদের সঙ্গে অবশ্য অন্য গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরাও ছিল, তবে কেউই আগে পরিচয় দেয়নি,’ আন্দোলন দমনে সরাসরি গোয়েন্দা হস্তক্ষেপ সম্পর্কে এভাবে স্মৃতিচারণায় বলেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক,  বর্তমান স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ শীর্ষক গ্রন্থে অভ্যুত্থানের দিনলিপি তুলে ধরেছেন সজিব ভূঁইয়া। গত মার্চে প্রথমা প্রকাশনের প্রকাশিত বইয়ে ‘ডিবি কার্যালয়ে ছয় দিন’ পর্বে তিনি তুলে ধরেন উত্তাল দিনগুলোর কথা।

জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনে আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। ছবি: ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘নাহিদ ভাই, বাকের আর আমি-প্রথমে আমাদের এই তিনজনকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। নিয়ে যাওয়া হলো ডিবির রমনা জোনের একটি কক্ষে। একজন সহকারী কমিশনার আমাদের সামনে তার রিভলবারটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন, “এখানে কোনো মাস্তানি চলবে না। যেভাবে বলা হবে, সেভাবেই থাকতে হবে। বেশি প্রশ্ন করা যাবে না। খাওয়াদাওয়া আর ওয়াশরুমের ব্যাপারটা ভালো ব্যবহার দিয়ে আদায় করে নিতে হবে।”

‘এরপর আমাদের এডিসি-অ্যাডমিনের কক্ষে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। “এসব করে লাভ কী, মানুষ মারা যাচ্ছে, পুরো দেশ স্থবির হয়ে আছে” ইত্যাদি বলে তারা আন্দোলন স্থগিত করতে বলল। আশ্বাস দিল, সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দিলে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর থেকেই বলা হচ্ছিল, পরদিন আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু আমাদের ছয় দিন ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়।’

তিনি বলেন ‘প্রথম দিনই আমাদের তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের (“ভাতের হোটেল”এর মালিক নামে খ্যাত ডিবি কর্মকর্তা) কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। তার ভাষা কোনো কর্মকর্তার মতো শোনাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গেস্টরুমে’ ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতা। তিনি বললেন, “তোমরা মনে করো যে তোমাদের ধরে এনে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী নেতা বানায়। আমি কিন্তু নেতা বানাই না, আমি নেতা ছোট করি।” হুমকি-ধমকি দিয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন, “কথামতো কাজ না করলে সমস্যা হবে।”

‘তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, এটা উল্লেখ করে হারুন বললেন, “তোমাদের সঙ্গে আমরা ভালো ব্যবহার করতে চাই। তোমরা সহযোগিতা করো।”

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘প্রথম দিনই তিনি তার ভাতের টেবিলে আমাদের নিয়ে বসিয়ে খাবার দেন। আমরা কেউই সেই খাবার স্পর্শ করিনি। প্রথম দিন খাবারের সঙ্গে ছবি তুললেও সেটি তারা কোথাও প্রকাশ করেনি। কথাবার্তার একপর্যায়ে হারুনের সঙ্গে বাকেরের সামান্য তর্ক হয়। হারুন প্রশ্ন করে, “তোমাদের মধ্যে শিবির কে?”

আরও পড়ুন

‘আমাদের তিনজনকে আলাদা আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছিল। কথা বলার জন্য আমাদের রমনা জোনের এডিসি-অ্যাডমিনের কক্ষে আনা হতো। কখনো তিনজনকে একসঙ্গে, মাঝেমধ্যে আলাদা আলাদা। কখনো কখনো আমাদের কক্ষে গিয়েও তারা কথা বলত। হারুনের সঙ্গে তর্ক করার কারণে প্রথম রাতে বাকেরকে টর্চার রুমে নিয়ে হাত বেঁধে মারধর করেন ডিবির রমনা জোনের এডিসি ফজলে এলাহী। বাকেরকে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হলেও কণ্ঠ শুনে সে বাকের এলাহীকে চিনতে পারে। আমি আর নাহিদ ভাই বেশ অসুস্থ ছিলাম। এ জন্য মারধরের হাত থেকে বেঁচে যাই। গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল থেকে ওষুধ বা প্রেসক্রিপশন বক্স কিছুই নিয়ে আসতে না পারায় আমাদের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে চলে যাচ্ছিল। আগেরবার তুলে নেওয়ার পরে আমার সঙ্গে কী কী করা হয়েছে, ডিবির রমনা জোনের ডিসি আমাকে ডেকে নিয়ে জানতে চাইলেন। কথা বলে মনে হলো, আমাকে যে পেথিডিন দেওয়া হয়েছে, এর সত্যতা যাচাই করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।’

ডিবির নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আরও নিখুঁতভাবে তদন্তের স্বার্থে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার জন্য একজন এসআই ও কয়েকজন কনস্টেবলসহ ডিসি আমাকে রাজারবাগের পুলিশ হাসপাতালে পাঠান। পরীক্ষার আধঘণ্টার মধ্যেই রিপোর্ট দেওয়া হলো। রিপোর্টে পাওয়া গেল, আমার রক্তে পেথিডিন আছে। আমার রক্তচাপও কম ছিল। শারীরিক অবস্থা ভালো নয় দেখে গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে লোক পাঠিয়ে আমার ওষুধগুলো নিয়ে আসে। এর পর থেকে আমাকে একটু দেখত প্রতিক্রিয়া বাইরে ভালো ছিল না। সরকারের ওপর প্রচুর চাপ ছিল। আমাদের তারা প্রতিদিনই বলছিল, পরের দিন ছেড়ে দেওয়া হবে। এর মধ্যেই একদিন হারুন আমাদের খাবার খাইয়ে সেই ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করেন। যে কক্ষগুলোতে আমাদের রাখা হয়েছিল, সেগুলো মূলত ডিবি কর্মকর্তাদের অফিস। সেখানে ঘুমানোর জন্য আলাদা কোনো জায়গা ছিল না। নামাজ পড়ার জায়গায় জায়নামাজ বিছিয়ে ঘুমাতে হতো।’

‘এক দিন পর নুসরাত তাবাসসুমকেও তুলে নিয়ে আসা হলো। তাকে রাখা হলো মিরপুর জোনের কক্ষে। আমাদের মনে হলো, বাকিদেরও নিয়ে আসা হবে। কথা বলার জন্য প্রতিদিনই আমাদের এডিসি-অ্যাডমিনের কক্ষে একত্র করা হচ্ছিল। আরও এক দিন পর সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে তুলে আনা হলো।’

আসিফ মাহমুদ আরো বলেন, ‘ধরে আনার পরে প্রথমেই তারা আমাদের ফোন কেড়ে নিয়েছিল। ফোনে আমাদের সঙ্গে যাদের কথা হয়েছে, তাদেরই একে একে ধরে আনা হচ্ছিল। আমাকে যে কর্মকর্তার কক্ষে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে আবদুল হান্নান মাসউদকে ধরে আনার জন্য একটা টিম পাঠানো হয়। রিফাত রশীদ ও আবদুল কাদেরকে তুলে আনার জন্যও টিম পাঠানো হয়। তারাই তখন আন্দোলন এগিয়ে নিচ্ছিল। ডিবি তাদের ধরতে পারেনি। আমরা মারাত্মক আতঙ্কে ছিলাম। সবাইকে ধরে নিয়ে এলে আন্দোলন চালিয়ে নেবে কে?’

‘আমরা ১৫-২০ মিনিট টেলিভিশনের স্কুল দেখার সুযোগ পেতাম। অনুরোধ করলে কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ পত্রিকা কখনো আমাদের দেওয়া হতো, কখনো আবার দেওয়া হতো না। ওই সময়ের পরিষ্কার চিত্র আমরা বুঝতে পারছিলাম না। প্রথমে নাহিদ ইসলাম, আবু বাকের আর আমাকে এবং পরে কখনো কখনো নুসরাতকে একসঙ্গে ডেকে নিয়ে ওরা আন্দোলন প্রত্যাহারের বার্তা দেওয়ার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করত। আলাদা হওয়ার পরে কক্ষগুলোতে গিয়ে এডিসি-অ্যাডমিন বলত, ওই দুজন তো রাজি হয়ে গেছে। বাকি দুজনকে হয়তো তারা আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করত। তাদেরও নিশ্চয়ই একই কথা বলত। আসলে কেউই রাজি হয়নি। আমাদের মধ্যে এই বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল। আমরা জানতাম, আন্দোলন প্রত্যাহারের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত কেউই নেবে না। একে অন্যের মুখ দেখার সুযোগ না পেলেও পরস্পরের প্রতি প্রগাঢ় আস্থাই আমাদের ঠিক পথে রেখেছিল।’

জুলাই অভ্যুত্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন অকুতোভয় ছাত্র-জনতা। ছবি: অনিক রহমান/টাইমস

‘আমরা বলছিলাম ৯ দফা দাবির কথা। তারা রাজি হচ্ছিল না। তারা তাদের মতো করে একটা বক্তব্য লিখে এনেছিল। আমরা বলছিলাম, বাইরে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করব। ভেতরে এক কথা বলে বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে বলব, এটাই ছিল আমাদের পরিকল্পনা। কিন্তু এর আগে ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে একই কৌশল প্রয়োগ করায় তারা রাজি হচ্ছিল না।’

‘আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য প্রচণ্ড মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছিল। হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে মেট্রোরেল ভাঙচুরসহ বিভিন্ন মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে আমাদের নাম দেওয়া হবে। বাকেরের মারধরের প্রসঙ্গ তুললে হারুন বলল, “বাকের ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখেছে।”

‘একপর্যায়ে ডিবি কার্যালয়ে আমাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসা হলো। তাদেরও কুখ্যাত ভাতের হোটেলে বসিয়ে হারুন সেই ভিডিও ফেসবুকে ছাড়ল। আমাদের পরিবারকে ডিবির লোকেরা বলল, আমরা ভালো আছি, সবাইকে এই বার্তা দিলে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। তারা সরল মনে তাদের কথা বিশ্বাস করে সাংবাদিকদের বললেন, “আমরা ভালো আছি।” এ কথার সত্যতা ছিল না। এটা ছিল তাদের চলমান আন্দোলনকে প্রশমিত করার কৌশল। পরিবারের সদস্যদের রাত ১২টা পর্যন্ত ডিবি কার্যালয়ে বসিয়ে রাখা হলো, কিন্তু আমাদের ছাড়া হলো না।’

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘ডিবির পক্ষ থেকে আমাদের কাছে আন্দোলন প্রত্যাহারের একটা লিখিত বার্তা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা ভাবলাম, এদের কথা শুনে আগে বের তো হই। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে বলে দেব যে আন্দোলন চলবে। তখন তাদের আর কী করার থাকবে! তাই তাদের দেওয়া বার্তা নিয়ে আর কোনো তর্কে যাইনি। ডিবির কর্মকর্তারা বলল, তোমরা সংবাদ সম্মেলনে যা বলবে, সেটা ভিডিও করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখিয়ে নিতে হবে। তিনি রাজি হলে তোমরা বাইরে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে পারবে। ওই ভিডিও যে তারা গণমাধ্যমে দিয়ে দেবে, সেটা আমাদের মাথায় আসেনি।’

‘ডিবির লোকেরা বলেছিল, ভিডিওর ওই বক্তব্যে স্বাক্ষর করলে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। কথা ছিল, তারাই আমাদের সংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা করে দেবে। আমরা সংবাদ সম্মেলনে তাদের লিখে দেওয়া বক্তব্য পাঠ করব। এই শর্ত মানলে আমরা স্বাধীন। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেই বক্তব্যে আমরা স্বাক্ষর দিয়েছিলাম। তবে উদ্দেশ্য ছিল বাইরে গিয়ে আমরা নিজেদের মতো করে সংবাদ সম্মেলন করব। তাদের কথা মানব না। তারাও এটা বুঝতে পেরেছিল। তাই চালাকি করে ভুল বুঝিয়ে আমাদের রেকর্ড করা ভিডিও তারা গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য পাঠিয়ে দেয়। এটা আমাদের জানা ছিল না। তা ছাড়া আমাদের ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ছাড়া হচ্ছিল না’, যোগ করেন আসিফ মাহমুদ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad