প্রিয়জন হারানোর বেদনা আর বিচার না পাওয়ার হতাশায় কেটে গেছে দুটি বছর। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মৃতি ধরে আজও দিন কাটাচ্ছেন কুষ্টিয়ার শহীদ পরিবারগুলো।
বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদদের স্বজনেরা। একই সঙ্গে মামলার বাদী ও সাক্ষীদের জীবননাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই কুষ্টিয়া শহরের কাস্টম মোড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। পরদিন ১৮ জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও গুলি চালায়।
এর ধারাবাহিকতায় ৪ ও ৫ আগস্ট থানা মোড় ও ছয়রাস্তার মোড় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে সাংবাদিকসহ প্রায় ১ হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হন। ৫ আগস্ট কিশোর আবদুল্লাহ, শহীদ ইউসুফ শেখসহ কুষ্টিয়ায় আটজন এবং জেলার বাইরে আরও আটজন শহীদ হন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, কুষ্টিয়ায় আহতের সংখ্যা ৫৯৫ এবং শহীদের সংখ্যা ১৬।
আন্দোলনে প্রাণ হারানো শহীদ ইউসুফ শেখের স্ত্রী ফাতেমা বলেন, ‘আমার স্বামী দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। কিন্তু দুই বছর পার হলেও আমরা বিচার পাইনি। যারা তাকে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
ইউসুফের মেয়ে সীমা বলেন, ‘বাবা হারানোর কষ্ট শুধু সেই বোঝে, যে হারিয়েছে। আমরা চাই সরকার শহীদ পরিবারের কষ্ট বুঝুক, পাশে দাঁড়াক এবং আত্মত্যাগের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করুক।’
কিশোর শহীদ আবদুল্লাহর বাবা লোকমান হোসেনও ছেলের হত্যার দ্রুত বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ছেলের হত্যার দ্রুত বিচার চাই, যাতে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারি।’
আবদুল্লাহর মা হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখে যেতে চান বলে জানান।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোর সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদেশ থেকেও ফোন করে সাক্ষীদের মেরে ফেলার হুমকি আসছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জুলাই আন্দোলনের মামলার বিচার ও সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে ক্ষোভ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম রাহুল পারভেজ।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলেও প্রশাসনের অভ্যন্তরে তাদের সহযোগীরা এখনো বহাল রয়েছেন। প্রশাসনে যে রদবদল করা হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে প্রধান আসামি করে করা মামলার বাদী এবং আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষী রাহুল। তিনি দাবি করেন, এ কারণে দেশ ও বিদেশ থেকে তাকে ধারাবাহিকভাবে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
রাহুল বলেন, হুমকির বিষয়টি তিনি অ্যাডিশনাল আইজিপি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও চিফ প্রসিকিউটরকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। পরে খুলনা বিভাগীয় ডিআইজিসহ প্রশাসনের দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আহত জুলাইযোদ্ধা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইকে দুই লাইনে শেষ করা যাবে না। যারা স্বজন হারিয়েছেন, কেবল তারা এর গভীরতা বোঝেন। শহীদদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করে সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।’
জুলাই-২৪ শহীদ সোসাইটি কুষ্টিয়া জেলার সভাপতি ও শহীদ বাবলু ফারাজির ছেলে সুজন মাহমুদ বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন তখনই হবে, যখন হত্যার বিচার নিশ্চিত হবে এবং শহীদ পরিবার ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার বাস্তবায়ন করা হবে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যা মামলাসহ মোট ৩৪টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলার চার্জশিট বা অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) খন্দকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, মামলাগুলোর সার্বিক অগ্রগতি তিনি নিয়মিত মনিটরিং করছেন। আইনি কিছু জরুরি প্রক্রিয়া গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সব মামলার চার্জশিট দাখিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে কিছুটা সময় লাগবে।


