শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক চলছে। কেউ এটিকে শিক্ষার্থীদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য বলেছেন, কেউ আবার বক্তব্যটির প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমার কাছে এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্যত্র। প্রশ্নটি হলো—কেন একটি মাত্র মন্তব্য এত সহজে একটি পুরো প্রজন্মের ক্ষোভ, অপমানবোধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার প্রতীকে পরিণত হলো?
আমার কাছে এই ঘটনাটি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হওয়া সাময়িক বিতর্ক নয়; বরং একটি দীর্ঘ সামাজিক ও রাষ্ট্রিক যাত্রার প্রতিফলন। একটি সমাজে ক্ষোভ একদিনে তৈরি হয় না। একটি প্রজন্মও হঠাৎ করে রাষ্ট্র কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারায় না। একজন মানুষের জন্ম থেকে কর্মজীবনে প্রবেশ পর্যন্ত অন্তত পঁচিশ বছরের একটি দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যাত্রা রয়েছে। সেই যাত্রাপথে পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নীতিনির্ধারণ—সব মিলেই একজন মানুষ গড়ে ওঠে। ফলে আজ যদি আমরা দেখি, যেকোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে দ্রুত বিস্ফোরিত হয় তরুণদের ক্ষোভ, তাহলে শুধু তাদের আচরণ বিশ্লেষণ করলেই হবে না; ফিরে তাকাতে হবে সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার দিকে, যার মধ্য দিয়ে আমরা এই প্রজন্মকে তৈরি করেছি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিতর্ক পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে মানুষের প্রতিক্রিয়া শুধু একটি বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া নয়; এটি আমাদের সমাজে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। আমরা খুব দ্রুত মানুষকে নায়ক বানাই, আবার সমান দ্রুত সেই নায়ককে ভেঙেও ফেলতে চাই। দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষামন্ত্রীকে এক ধরনের ‘সুপারস্টার’ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। হেলিকপ্টারে করে নকলবিরোধী অভিযান, কঠোর প্রশাসকের ভাবমূর্তি এবং ভাইরাল ভিডিও—সব মিলিয়ে তিনি একজন নীতিনির্ধারকের চেয়ে বেশি একটি জন-চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে নায়ক নির্মাণের মতোই নায়ক ভাঙাও যেন জনবিনোদনের অংশ হয়ে গেছে। ব্যক্তি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের প্রতীকে পরিণত হন, আর সেই প্রতীকের পতনকে আমরা সমষ্টিগত বিনোদনে রূপ দিই।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। একজন শিক্ষামন্ত্রী কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিনিধি। যখন সেই প্রতিনিধিকেই সবচেয়ে বেশি বিদ্রূপ, অবমাননা কিংবা সামাজিক উপহাসের মুখোমুখি হতে হয়, তখন সমস্যাটি আর ব্যক্তির থাকে না; সেটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা নেতৃত্বের প্রতি সমাজের আস্থার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
গত কয়েক বছরে আমরা এমন অনেক দৃশ্য দেখেছি, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না। কোথাও অভিভাবক প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছেন, কোথাও শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান করা হচ্ছে, কোথাও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ে বিচার করা হচ্ছে, কোথাও আবার শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, এগুলো একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
এই অবক্ষয়ের পেছনে শুধু সামাজিক পরিবর্তন নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও ভূমিকা রয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, পাকিস্তানি রাষ্ট্রপরিচয়ের অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের টানাপোড়েন, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তী দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ—প্রতিটি অধ্যায় কোনো না কোনোভাবে শিক্ষার দর্শন এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নকে প্রভাবিত করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক পর্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ, ছাত্ররাজনীতি থেকে নীতিনির্ধারণ—অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিচয় যোগ্যতার পাশাপাশি, কখনো কখনো তারও আগে গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে একজন শিক্ষাবিদের প্রথম পরিচয় ধীরে ধীরে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সময়ের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, আর সেই সঙ্গে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বদলে গেছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমন একটি নিরপেক্ষ নৈতিক পরিসরে পরিণত করতে পারিনি, যেখানে শিক্ষক প্রথমে শিক্ষক, উপাচার্য প্রথমে শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে শিক্ষানীতির অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হবেন। বরং ধীরে ধীরে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিভাজন যত বেড়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সামাজিক আস্থাও তত ক্ষয় হয়েছে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু রাজনীতি বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের পুরো শিক্ষাদর্শনকে প্রভাবিত করেছে। একটি শিক্ষাব্যবস্থার কাজ শুধু তথ্য শেখানো নয়; তার কাজ ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করা। আজ যে শিশুটি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হচ্ছে, বিশ বা পঁচিশ বছর পরে সে রাষ্ট্রের কর্মশক্তি, গবেষক, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, বিচারক কিংবা নীতিনির্ধারক হবে। কিন্তু আমরা খুব কমই নিজেদের জিজ্ঞেস করেছি—আমরা আসলে কী ধরনের নাগরিক গড়ে তুলতে চাই? আমরা কি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থী চাই, নাকি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, মতভেদকে ধারণ করতে পারে এবং দেশকে নিজের বলে মনে করে এমন মানুষও চাই?
এই প্রশ্নটি যে কেবল দার্শনিক নয়, তার বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। ইউনেসকো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বিনিয়োগের সুপারিশ করে আসছে। বাংলাদেশ এখনো সেই লক্ষ্যের নিচে রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বিভিন্ন শ্রমবাজার গবেষণা ধারাবাহিকভাবে দেখাচ্ছে যে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব উদ্বেগজনক এবং দক্ষতার অমিল একটি ক্রমবর্ধমান নীতিগত চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি দৃশ্যমান বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে একজন তরুণ দেখছে, ডিগ্রি থাকলেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে সরকারি চাকরির প্রতি তীব্র ঝোঁক, কোটা আন্দোলন কিংবা কর্মসংস্থানকে ঘিরে সামাজিক অস্থিরতাকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। এর ভেতরে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
আমার কাছে বাংলাদেশের বর্তমান সংকটকে আমরা প্রায়ই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করি। আমরা শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমস্যা, বেকারত্বকে অর্থনীতির সমস্যা, ছাত্র আন্দোলনকে রাজনীতির সমস্যা এবং সামাজিক অস্থিরতাকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে আলাদা আলাদা দেখি। অথচ এগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শিক্ষা শেষ পর্যন্ত শুধু একজন মানুষের কর্মজীবন নির্ধারণ করে না; সে রাষ্ট্রকে কীভাবে দেখবে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি কতটা আস্থা রাখবে, মতভেদ কীভাবে প্রকাশ করবে এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কতটা আশাবাদী হবে—সেই মানসিকতাও তৈরি করে।
এ কারণেই আমার কাছে কোটা আন্দোলন, সাম্প্রতিক এইচএসসি আন্দোলন কিংবা বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসাকে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা বলে মনে হয় না। প্রতিটি আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হতে পারে, কিন্তু গভীরে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—এই শিক্ষাব্যবস্থা একজন তরুণকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? শিক্ষা যদি দক্ষতা না দেয়, দক্ষতা যদি কর্মসংস্থানে রূপ না নেয়, আর কর্মসংস্থান যদি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তাহলে হতাশা ও ক্ষোভ একসময় রাজনৈতিক ভাষা খুঁজে নেবে। তাই এসব আন্দোলনকে কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনার ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এগুলো একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা, শ্রমবাজার এবং প্রতিষ্ঠানগত আস্থার সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
এখানেই এসে আমরা একটি মৌলিক প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি। শিক্ষানীতি নিয়ে আমরা বহুবার বিতর্ক করেছি, কিন্তু নাগরিক তৈরির দর্শন নিয়ে কখনো জাতীয় বিতর্ক গড়ে তুলিনি। আজ যে শিশুটি স্কুলে যাচ্ছে, সে বিশ বা পঁচিশ বছর পরে কী ধরনের মানুষ হবে—এই প্রশ্নটি আমাদের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে খুব কমই এসেছে। আমরা পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে ভেবেছি, পাঠ্যক্রম নিয়ে ভেবেছি, ইতিহাসের ভাষ্য নিয়ে ভেবেছি; কিন্তু সেই শিক্ষাব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কী ধরনের নাগরিক গড়ে তুলবে, সেই দীর্ঘমেয়াদি দর্শন নিয়ে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐকমত্য তৈরি করতে পারিনি।
এর ফলে শিক্ষা ধীরে ধীরে মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া থেকে পরীক্ষায় সফল হওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। শৈশব শুরু হয় ভালো ফল করার চাপ দিয়ে, কৈশোর কাটে ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কাটে আরেকটি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে, আর স্নাতক হওয়ার পর শুরু হয় চাকরির পরীক্ষার নতুন অধ্যায়। পুরো শিক্ষাজীবন যেন একের পর এক পরীক্ষার করিডোর। সেখানে কৌতূহলের চেয়ে নম্বর, চিন্তার চেয়ে মুখস্থবিদ্যা, সৃজনশীলতার চেয়ে প্রতিযোগিতা এবং নাগরিকত্বের চেয়ে ক্যারিয়ার বেশি গুরুত্ব পায়। শিক্ষা তখন আর মানুষকে বড় করে না; শুধু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল শেখায়।
কিন্তু মানুষ শুধু বিদ্যালয়ে গড়ে ওঠে না; সমাজও তাকে গড়ে তোলে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের নগরায়ণ দ্রুত হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে শিশু-কিশোরদের সামাজিক বিকাশের পরিসর তৈরি হয়নি। খেলার মাঠ কমেছে, সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গা সংকুচিত হয়েছে, আর মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন ক্রমশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। অসংখ্য পরিবারে বাবা-মায়ের দৈনন্দিন জীবন এখন সন্তানের স্কুল, কোচিং এবং পরীক্ষার সময়সূচিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। শিশুর স্বাভাবিক শৈশব ধীরে ধীরে একটি প্রকল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাফল্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে পরীক্ষার ফল; মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠা নয়।
এই প্রেক্ষাপটেই ‘ফার্মের মুরগি’ উপমাটি আমার কাছে একটি অস্বস্তিকর প্রতীক হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের এভাবে আখ্যায়িত করা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু উপমাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা দর্শনটিকে এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। একটি ফার্মের মুরগি জানে না, কেন তাকে এত যত্নে লালন-পালন করা হচ্ছে। নিয়মিত খাবার, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, দ্রুত বেড়ে ওঠার ব্যবস্থা—সবকিছুই তার কাছে যত্নের প্রকাশ। কিন্তু সেই যত্নের উদ্দেশ্য তার স্বাভাবিক বিকাশ নয়; বরং যত দ্রুত সম্ভব তাকে একটি পূর্বনির্ধারিত অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যের উপযোগী করে তোলা। সে জানে না কেন তার খোলা মাঠ নেই, কেন সে নিজের স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে না, কিংবা কেন তার জীবনকে শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য পরিকল্পিত করা হয়েছে। ব্যর্থতাটি তাই মুরগির নয়; ব্যর্থতাটি পুরো ফার্মিং ব্যবস্থার।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে আজ আমারও ঠিক সেই প্রশ্ন। আমরা কি শিক্ষার্থীদের সত্যিকার অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি, নাকি খুব অল্প বয়স থেকেই একটি পূর্বনির্ধারিত প্রতিযোগিতা, পরীক্ষা, চাকরি এবং শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করছি? একই পাঠ্যক্রম, একই কোচিং সংস্কৃতি, একই পরীক্ষার চাপ এবং একই ধরনের সাফল্যের সংজ্ঞা কি তাদের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ সংকুচিত করে দিচ্ছে না? যদি একটি শিশুর কৌতূহল, সৃজনশীলতা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং নাগরিক বোধের চেয়ে পরীক্ষার ফল ও চাকরির প্রস্তুতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে ব্যর্থতাটি শিক্ষার্থীর নয়; ব্যর্থতাটি সেই শিক্ষা-দর্শনের, যা স্বাধীন মানুষ গড়ার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর উপযোগী মানুষ তৈরি করতে চায়। আমার কাছে ‘ফার্মের মুরগি’ বিতর্কের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি এখানেই।
এই জায়গায় পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজনৈতিক মতভেদ আছে, সরকার বদলায়, ছাত্র আন্দোলনও হয়। কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের প্রতি একটি মৌলিক সামাজিক সম্মানও সচেতনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখানো হয়—প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে অপমান করা যায় না; শিক্ষকের সঙ্গে মতভেদ হতে পারে, কিন্তু শিক্ষককে সামাজিকভাবে ধ্বংস করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই সংস্কৃতি কোনো একদিনে তৈরি হয়নি; পরিবার, বিদ্যালয়, সামাজিক অনুশীলন এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে এটি গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশেও একসময় শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা ছিল না; এটি ছিল একটি সামাজিক মর্যাদা। আজ সেই মর্যাদা দৃশ্যমানভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে—শুধু শিক্ষকদের কারণে নয়, শুধু রাজনীতির কারণেও নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক অবিশ্বাসের ভেতরে ঠেলে দেওয়ার কারণে। এর ফল শুধু শিক্ষকদের মর্যাদাহানি নয়; এর ফল নতুন প্রজন্মের মধ্যেও প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ক্ষয়।
‘ফার্মের মুরগি’ বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কোনো একজন শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্য নয়। এটি আমাদের সামনে এমন একটি প্রশ্ন তুলে ধরে, যেটি আমরা দীর্ঘদিন এড়িয়ে গেছি—আমরা কি ভবিষ্যতের নাগরিক গড়ে তুলছি, নাকি কেবল ভবিষ্যতের পরীক্ষার্থী, কর্মী কিংবা রাজনৈতিক সমর্থক তৈরি করছি? শিক্ষা শেষ পর্যন্ত শুধু জ্ঞান দেয় না; শিক্ষা একটি জাতির চরিত্র নির্মাণ করে।
এই কারণেই আমি মনে করি, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনা শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আমাদের আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন করতে হবে—আজ যে শিশুটি স্কুলে যাচ্ছে, পঁচিশ বছর পরে আমরা তাকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই? সে কি শুধু একটি চাকরির প্রার্থী হবে, নাকি এমন একজন নাগরিক হবে, যে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে, প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করতে পারে এবং একই সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতেও জানে?
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় দিতে পারবে না। এর উত্তর খুঁজতে হবে পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগে। কারণ, মানুষ তৈরির কাজ কখনোই শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতরে সম্পন্ন হয় না; এটি একটি সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক অনুশীলনের ফল।
আমরা গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি করেছি, অবকাঠামো নির্মাণ করেছি, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার—এই উন্নয়নের ভেতর আমরা কি সমান গুরুত্ব দিয়ে মানুষ গড়ার প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে পেরেছি? যদি শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কৌতূহলের পরিবর্তে ভয়, সৃজনশীলতার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যা, সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা এবং নাগরিক বোধের পরিবর্তে কেবল পেশাগত সাফল্য শেখায়, তাহলে সেই সংকট কোনো একক সরকারের নয়; সেটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রিক সংকট।
সম্ভবত এ কারণেই আজ শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্য এত বড় সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। কারণ মানুষ শুধু একটি শব্দের প্রতিক্রিয়া জানায়নি; তারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বহু বছরের জমে থাকা অভিজ্ঞতা, হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং আস্থাহীনতার প্রতি। একটি মন্তব্য তখনই জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়, যখন সমাজ আগে থেকেই সেই বিতর্কের জন্য প্রস্তুত থাকে।
তাই ‘ফার্মের মুরগি’ বিতর্ককে আমি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখি না। আমি এটিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখি। এই বিতর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষা শুধু দক্ষ কর্মী তৈরি করার প্রকল্প নয়; শিক্ষা একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি নির্মাণেরও প্রকল্প। যদি সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করে।
ইতিহাস কোনো জাতিকে শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উড়ালসেতু কিংবা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত দেখে, সেই জাতি কী ধরনের মানুষ গড়ে তুলেছে। কারণ, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার নির্মিত স্থাপনাও নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। আর সেই মানুষকে কীভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘ফার্মের মুরগি’ বিতর্ক আমাদের সামনে শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নটিই নতুন করে উত্থাপন করেছে।
এই প্রশ্নের উত্তর আজই পাওয়া যাবে না। কিন্তু যদি আমরা অন্তত প্রশ্নটি সঠিকভাবে করতে শিখি, তাহলে হয়তো এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় অর্জন সেখানেই নিহিত থাকবে।
লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা আবু শাহেদ ইমন


