বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কিছু অধ্যাদেশ অনুমোদন না করায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ‘বাতিলের খাতায়’ পড়বে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রতিকার পাওয়া কঠিন হবে বলেও মনে করছে তারা। দুর্নীতি দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে-এমন মতও দিয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকাররের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবাদকর্মীদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এতে।
লিখিত বক্তব্যে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইখতেখারুজ্জামান বলেন, বিচারবিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় বিষয়ক তিনটিসহ মোট চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করতে সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এর বাইরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনের এবং গুম প্রতিরোধ করাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই আইনে পরিণত না করে পরবর্তী সময়ে যাচায় বাচায়ের মাধ্যমে নতুন করে আনার সুপারিশ করা হয়েছে, যা বিচারবিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টিকে একেবারেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
বিচারক নিয়োগের বিষয়টি আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাবে বলে মত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সেটি ‘সরকার প্রধানের ইচ্ছানুমাফিক হয়ে পড়বে, যা এক পা এগিয়ে দুই পা পেছনে হাঁটার শামিল।’
টিআইবি বলছে, ‘মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিধানের অভাবে মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে, তার ভুক্তভোগী ক্ষমতাসীন দলটি এর প্রয়োজনীয়তা কেন এখনো উপলব্ধি করতে পারছে না?’
দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে লিখিতভাবে সমর্থন জানিয়েছে, সেগুলোর আলোকে দুদক অধ্যাদেশটি সংশোধন করে আইন হিসেবে অনুমোদনের দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
৯৮টি অধ্যাদেশকে হুবহু আইনে পরিণত করার সুপারিশকে ‘সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য’ উল্লেখ করে টিআেইবি বলছে, ‘আইনে পরিণত হতে যাওয়া সব অধ্যাদেশকে কিছু ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়েছে।’
তথ্য অধিকার (সংশোধন) আইন ২০২৫ এ তথ্যের সংজ্ঞা, কর্তৃপক্ষের আওতা বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু বিষয় সংযোজনের দাবিও করেছে সংস্থাটি।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের আগে এর মানবাধিকার বিষয়ক প্রভাব বিশ্লেষণের কথাও বলছে সংস্থাটি। এতে অপরাধ প্রতিরেনাধের নামে ব্যক্তিগত উপাত্তে ঢালাও প্রবেশাধিকারের সুযোগ রাখা হয়েছে বলে মত দিয়ে বলা হয়, ‘যা উপাত্ত সুরক্ষার নামে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে ‘কনটেন্টের মতো বিষয়’তে যুক্ত করায় এটি ভবিষ্যতে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশে কিছু মৌলিক ঘাটতি রয়েছে বলে মত দিয়ে টিআইবি বলছে, এতে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা কমবে।
মহা হিসাব নিরীক্ষকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে পেশের পর সেগুলো সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবিও করা হয় এতে। জাতীয় সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যকতার সুপারিশও করেছে তারা।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ বাতিলের দাবিও জানিয়েছে টিআইবি। পুলিশকে জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন প্রয়োজন, সেটি এতে নেই বলেও মনে করে সংস্থাটি।
জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ও বাতিলের দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। এতে বলা হয়, অধ্যাদেশে একই কর্তৃপক্ষকে নিয়ন্ত্রক ও সেবা প্রদানকারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করায় এতে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে।


