সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মন্তব্য করেছেন, বিএনপি জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাদের নীতি নির্ধারকদের মাথা ‘আউলা-ঝাউলা’ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি চিন্তা করছিলাম কেন তারা জনগণের দাবি অগ্রাহ্য করে নানা অধ্যাদেশ বাতিল এবং অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ৪টি অধ্যাদেশ রহিত এবং ১৬টি অধ্যাদেশ উল্টাপাল্টা করা হয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাদের মাথায় কোনো প্রজ্ঞা নেই।’
সোমবার ঢাকার কাওরান বাজারে বিডিবিএল ভবনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল, গুম প্রতিরোধ/প্রতিকার অধ্যাদেশ স্থগিত এবং সুশাসন ও মানবাধিকারের হুমকি শীর্ষক নাগরিক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
এই সংলাপের আয়োজন করেছে ভয়েস ফর রিফর্ম এবং এতে সভাপতিত্ব করেন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম।
বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘যৌক্তিকতা, প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে না লাগিয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে সরকার (বিএনপি) শাসন করার চেষ্টা করছে।’
ইতিহাসের শিক্ষা
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি অভিশাপ। ১৯৭৩ সালের সংসদে সরকারি দলের যে অবস্থা ছিল, তার পরিণতি আমরা জানি; বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করা এবং সামরিক আইন জারি করা হয়েছিল। এরপর ২০০১ সালে, আবারও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিণতিতে আমরা গ্রেনেড হামলা, সারা দেশে বোমা বিস্ফোরণ এবং বিচারপতির বয়স বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি দেখেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারপর ২০০৮ সালে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিণতি ছিল পঞ্চদশ সংশোধনী, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে পাল্টে দেওয়া। এসব পরিণতি কি ইতিবাচক ছিল? এটি আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা হওয়া উচিত, যেন আমরা আবারও এই দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিশাপ ভোগ না করি।’
গুম অধ্যাদেশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘আমার মনে হয়, গুম অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতে। কারণ, কিছু লোকের বিচার হচ্ছে যারা সবুজ গাড়িতে আদালতে যাতায়াত করেন। এইসব লোকদের উর্দি নাকি অপমানিত হয়। যে দেশের আর্মি নিজের দেশে হত্যা করে, তাদের আপনি কিসের ইন্ডেমিনিটি দেবেন? এই লোকদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হবে? এর পেছনে বিএনপির সম্পর্ক আছে, এমনটা আমার বিশ্বাস। তবে আমার ভুলও হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘যে দেশগুলোতে গুমের বিচার হয়েছে, যেমন আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেখানে বিচার করা হয়েছে। আমাদের এখানে গুমের বিচার হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দরকার হয়, কারণ এটি সংবিধানের অভিভাবক। সংসদের কোনো আইন সংবিধান পরিপন্থি হলো কিনা সেটা দেখে বিচার বিভাগ, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন বিচার বিভাগ বাতিল করে দেয়। পৃথিবীতে যে কোনো দেশে সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য তারা অত্যন্ত যত্ন সহকারে পদক্ষেপ নিয়েছে, তিনি বলেন।
দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি জানেন না যে, ডেমোক্রেসি মানে হলো লিমিটেড গভর্মেন্ট? সরকারের পাওয়ার সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
সংসদে সুশাসন
এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ মন্তব্য করেন, ‘সময় ও চেয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের মানসিকতা পরিবর্তিত হচ্ছে। আমরা দেখেছি , বড় মেজোরিটিতে রাষ্ট্রের বিপর্যয় ডেকে আনে। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রব্যবস্থার সিস্টেম বদলানোর।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের এখনো এই সিস্টেমটিকে পরিবর্তন করতে হবে। একচোখা পদ্ধতিতে সরকারের পরিচালনা জাতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আমাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে, আর এজন্য সঠিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।’
একজন বক্তা সংসদ সার্বভৌমত্ব নিয়ে মন্তব্য করেন, ‘সরকারি দলের নেতারা বলছেন, সংসদ সার্বভৌম। আমাদের সংবিধান নিয়ে অজ্ঞতা দূর করা দরকার। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সার্বভৌম, কারণ সেখানে কোনো লিখিত সংবিধান নেই। তবে, আমাদের দেশে যেখানে লিখিত সংবিধান আছে, সেখানে সংসদ সার্বভৌম হতে পারে না।’
শহিদুল আলম বলেন, ‘এই অধ্যাদেশকে গ্রহণ করে পরে সংশোধন করলে কী দোষ ছিলো। রাজনীতিবিদরা যা বলে ও করে তার মধ্যে ফাঁক থাকে। ফাঁক থাকে বলেই আমরা এটাকে ভিন্নভাবে দেখি, এর ওপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাই।’
যদি গদি একই থাকে, একজন আরেকজনের জায়গায় বসে; তাতে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না। কোনো রকমের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে, ফেরেশতারাও গদিতে বসলে অনিয়ম করবে, যোগ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এ বি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, রাজনীতিবিদ তাসনিম জারা, আইনজীবী মানজুর আল মতিন, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, আইন ও সংবিধান বিশ্লেষক খালেদ মহিউদ্দিন।


