আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় উদ্ধার হওয়া ‘প্রেসার কুকার বোমা’ থেকে শুরু করে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে উদ্ধার হওয়া ‘ছাতা বোমা’–এসব বিস্ফোরক একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাভারের একটি আস্তানায় তৈরি করা হচ্ছিল বলে সন্দেহ করছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
এর মধ্যেই সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের সাধাপুর এলাকায় আবারও স্কচটেপে মোড়ানো একটি প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি নিরাপদভাবে নিষ্ক্রিয় করার কাজ শুরু করে।
প্রেসার কুকারের ভেতরে থাকা বস্তুটি বোমা বলে টাইমস অব বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন সিটিটিসি ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে সাধাপুর গোপের বাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের মাঠে একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতরে কাপড়-চোপড়, কোরআন শরীফ এবং একটি প্রেসার কুকার দেখতে পান স্থানীয়রা। সন্দেহজনক বস্তুটি ড্রাম থেকে বের করে মাঠে রেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাতে অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তি ড্রামটি মসজিদের মাঠে রেখে চলে যান। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি।
আরও পড়ুন: সাভারে মসজিদের মাঠে বোমাসদৃশ বস্তু, ঘিরে রেখেছে পুলিশ
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয় এটি একটি প্রেসার কুকার বোমা হতে পারে। পরে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়। ইউনিটের সদস্যরা বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার কার্যক্রম শুরু করেন।’
এর আগে গত ৩০ জুলাই রাতে আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় ‘জয়ী জেনারেল স্টোর’-এর সামনে একটি পরিত্যক্ত ব্যাগ থেকে একটি প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। সেবারও ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিট নিরাপদ স্থানে নিয়ে সেটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে।
এদিকে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সাভারের হেমায়েতপুরের শ্যামপুর এলাকায় একটি চারতলা ভবন ঘিরে অভিযান চালায় সিটিটিসি, স্থানীয় থানা পুলিশ, এনএসআই এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত চলা ওই অভিযানে প্রথমে পাঁচটি, পরে আরও আটটিসহ মোট ১৩টি পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি জেএমবির লিফলেট, বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
এর আগে একই এলাকা থেকে আরিফ হোসেন নামে এক যুবককে পাঁচটি তাজা হাতবোমাসহ আটক করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য মতে, তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই শ্যামপুরের ওই আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তদন্তকারীদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো উদ্ধার হওয়া বোমাগুলোর গঠনপ্রণালী। বাসাবাড়ির পানির লাইনে ব্যবহৃত সাধারণ পাইপ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এসব বোমা। এ কারণে এগুলো সহজে নজর এড়িয়ে বহন ও সংরক্ষণ করা সম্ভব।
সিটিটিসি সূত্রে জানা গেছে, শ্যামপুরের ওই বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক এবং সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি বোমাসদৃশ বস্তুর মধ্যে কারিগরি মিল রয়েছে। তদন্তকারীরা মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে উদ্ধার হওয়া ‘ছাতা বোমা’র সঙ্গেও সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি কেরানীগঞ্জে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গেও এই নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এই নেটওয়ার্কের অন্যতম সন্দেহভাজন সংগঠক নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’ এখনও পলাতক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তিনি নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বিস্ফোরক তৈরিতে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। তার নেতৃত্বে একটি গোপন সেল সক্রিয় ছিল বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। তবে এসব অভিযোগ তদন্তাধীন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
বাড়ির মালিক আব্দুল জলিল ও তার মেয়ে ইলমা সাংবাদিকদের জানান, গত ২ আগস্ট ‘আব্বাস আলী’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি আরেকজনকে নিয়ে বাসা ভাড়া নেন। তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি পাবনায় এবং তারা ড্রাইভিংয়ের কাজ করেন।
পরিবার নিয়ে বসবাস করবেন বলেই তাদের বাসা ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। তারা বাসার ভেতরে বোমা ও বিস্ফোরক লুকিয়ে রেখেছিলেন—এমন তথ্য তাদের কাছে ছিল না বলেও দাবি করেন।
ওসি সাইফুল আলম টাইমসকে বলেন, ‘শ্যামপুর এলাকা থেকে মোট ১৪টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিটিটিসি বিস্ফোরক চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে।’
পুলিশ ও সিটিটিসি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনাগুলোর সঙ্গে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সিটিটিসি প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক বুধবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরবেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সাভারে পরপর দুটি প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার এবং একই এলাকায় বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির উপকরণ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।


