বগুড়া কারাগারের ছাদ ফুটো করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার কয়েদি পালানোর ঘটনায় দায় কার, এই প্রশ্নে স্বরাষ্ট্র ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের তদন্ত কমিটি বগুড়া গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম শাহরিয়ারকে দায়ী করেছে। তবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তার কোনো দায় দেখেনি।
বগুড়া কারা কর্তৃপক্ষ গণপূর্তের সেই কর্মকর্তাকে কারাগার মেরামতে একাধিকবার চিঠি দিলেও গণপূর্তের তদন্তে সেটি স্বীকার করা হয়নি, যদিও সেই কর্মকর্তা নিজে বিষয়টি স্বীকার করে বক্তব্য দিয়েছেন। কারা কর্মকর্তারা গণপূর্তের তদন্ত কমিটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেন টাইমসকে বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছে।
তিনি বলেন, কারও পক্ষে ছাদের দেয়াল ফুটো করা সহজ কথা নয়। স্থাপনা দুর্বল না হলে ছাদ ফুটো করা যায় না। এজন্য কারা কর্তৃপক্ষ গণপূর্তকে বারবার জানিয়েছিল। ঘটনার পর কারাগারের স্টাফদের অনেককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গণপূর্ত কেন দায় এড়িয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে, তা বোধগম্য নয়।
২০২৪ সালের ২৫ জুন দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বগুড়া জেলা কারাগারের পুরাতন কনডেম সেলের (জাফলং সেলের ২ নম্বর কক্ষ) ছাদ ১০ ইঞ্চি ফুটো করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার বন্দি পালিয়ে যান। তারা কনডেম সেলের ছাদ ফুটো করে বের হওয়ার পর বিছানার চাদর ব্যবহার করে কারাগারের উঁচু দেওয়াল টপকে বাইরে বের হন।
পালিয়ে যাওয়া চার আসামি হলেন কুড়িগ্রামের নজরুল ইসলাম, নরসিংদীর আমির হোসেন এবং বগুড়ার জাকারিয়া ও ফরিদ শেখ।
পালিয়ে যাওয়ার পর ভোর রাত ৪টা ১০ মিনিটের দিকে বগুড়া শহরের চেলোপাড়া চাষী বাজার এলাকা থেকে পুলিশ চারজনকেই আবার গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় বগুড়া জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও গণপূর্ত-দুই মন্ত্রণালয়ই তদন্ত কমিটি গঠন করে। এর মধ্যে জেলা প্রশাসক ও স্বরাষ্ট্রের কমিটি এএইচএম শাহরিয়ারের ‘গাফলতি’কে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়। তবে গণপূর্তের কমিটি তার দায় দেখেনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন পাওয়ার পর শাহরিয়ারকে কেন চাকরিচ্যুত করা হবে না, তার কারণ ব্যাখ্যা করে তাকে ১০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলেছিলেন গণপূর্তের সেই সময়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে তদন্ত কর্মকর্তাও নিয়োগ করা হয়। কিন্তু পরে পাল্টে যায় সব কিছু।
স্বরাষ্ট্র ও গণপূর্তের তদন্ত কমিটি কারাগার পরিদর্শন করে। তারা কারারক্ষী, কর্মকর্তা, গণপূর্ত ডিজাইন শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী, বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ারসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ করে। এরপর তিন কমিটির প্রতিবেদনে আসে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য।
ঘটনার দুই বছর পরও গণপূর্তের কর্মকর্তা এএইচএম শাহরিয়ার চাকরিতে বহাল আছেন। তবে বগুড়া থেকে তাকে বদলি করা হয়েছে নওগাঁয়।
দুই মন্ত্রণালয়ের দুই ধরনের প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব ওবায়দুর রহমান বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না। খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) প্রশ্ন শুনে বলেন, ‘স্যার এ বিষয়ে এখন কথা বলবেন না।’
কারা কর্তৃপক্ষ যা বলেছিল
২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বগুড়া জেলা কারাগারের সুপার মো. আনোয়ার হোসেন বগুড়া গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএম শাহরিয়ারের কাছে চাহিদাপত্র পাঠান। সেখানে বলা হয়, কারাগারের জাফলং সেলের পাঁচটি কক্ষ পুরানো হওয়ায় ছাদের টালি খুলে পড়ছে। এই সেলে জেএমবি (নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন) ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছে। সেলের ছাদ পুরোনো ও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ছাদের টালি ফেলে নতুন আরসিসি ছাদ নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, সেলের দেয়াল ও মেঝের পলেস্তারা খুলে ইট বের হয়ে গেছে। বন্দি আটকে রাখতে ও সেল মেরামত এবং ছাদ নতুনভাবে নির্মাণ করা প্রয়োজন। ওই বছরের ১৮ জুন জেল সুপার আরও ১২টি সমস্যার কথা জানিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দেন।
তদন্ত কমিটিতে শাহরিয়ারের ভাষ্য
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গণপূর্তের তদন্ত কমিটির কাছে শাহরিয়ার দাবি করেন, কারা কর্তৃপক্ষের চাহিদা মতে অপ্রতুল বরাদ্দ থাকায় কারারক্ষী ব্যারাক ও দরবার কক্ষের সংস্কার এবং রং করা হয়েছে। ভবনের আরসিসি ছাদ নির্মাণ করা যায়নি।
কারাগারের পত্র অস্বীকার
গণপূর্তের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল গোফফারকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দি পালানোর ঘটনায় শাহরিয়ার দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি কারা কর্তৃপক্ষ যে চাহিদাপত্রের কথা বলছে, এমন কোনো পত্র পাওয়ায় যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ শাহরিয়ারের বক্তব্যেই কারা কর্তৃপক্ষের দুটি তাগিদপত্র এবং অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে ছাদ নির্মাণ না করার কথা বলা হয়।
শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম গত ২ আগস্ট যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, তাতে তার দায় নেই বলে উল্লেখ করেছেন। তার প্রতিবেদনেও বগুড়া জেলা কারাগার থেকে একাধিক পত্র দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। এ নিয়েই প্রশ্ন তুলছে কারা কর্তৃপক্ষ।
কারণ দর্শানোর চিঠিতে কী ছিল
গত ২২ ফেব্রুয়ারি শাহরিয়ারকে দেওয়া কারণ দর্শানোর চিঠিতে উল্লেখ ছিল, ‘বগুড়া কারা কর্তৃপক্ষ ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার কথা জানিয়ে মেরামত, সংস্কার ও ছাদ নির্মাণের জন্য বারবার পত্র দিলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। আপনার এমন কার্যক্রম দায়িত্বে অবহলা ও পেশাগত অদক্ষতার প্রকাশ, যা সরকারি চাকরিবিধি অসদাচরণের শামিল। এজন্য আপনাকে কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, তা ১০ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হলো।’
লিখিত জবাব ছাড়াও আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত শুনানি চাইলে তাও জানাতে বলা হয়।
শাহরিয়ার টাইমসকে বলেন, ‘বিভাগীয় তদন্তে সব অসত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাই আমার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’


