চার দিনের সফরের অংশ হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী ১১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কবর জিয়ারত করবেন। তার এই সফরকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইল জেলায় শুরু হয়েছে সাজসাজ রব। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনা।
তবে সফরের উচ্ছ্বাসের মাঝেই জেলার আটটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটি আসনে–টাঙ্গাইল-২, টাঙ্গাইল-৩ ও টাঙ্গাইল-৫–দলীয় কোন্দল ও গৃহদাহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসব আসনে বিএনপির স্থানীয় নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন।
তারেক রহমানের সফর ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ থাকলেও সংশ্লিষ্ট তিন আসনের কর্মীরা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে কোন প্রার্থীর পক্ষে থাকবেন–এ নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। একইভাবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে দ্বিধা ও দোটানা। পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন তারা। ফলে সফরকে সামনে রেখে স্থানীয় নেতাকর্মীরা একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক সমাধান প্রত্যাশা করছেন। জানা গেছে, অনেকেই তারেক রহমানের সুস্পষ্ট নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
টাঙ্গাইল-৫ আসনে টুকু বনাম ফরহাদ
টাঙ্গাইল-৫ আসনে আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। অপরদিকে একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু একজন হেভিওয়েট রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। তিনি ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পারিবারিকভাবেও তিনি বিএনপির রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার বড় ভাই আব্দুস সালাম পিন্টু টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সাবেক উপমন্ত্রী এবং বর্তমানে কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর তিনি গত বছরের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পান। এবারের নির্বাচনে তিনি টাঙ্গাইল-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল ছাত্রদল থেকে উঠে আসা একজন সংগঠক। কলেজ ভিপি থেকে শুরু করে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি, পরে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি বিগত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
এই আসনে উভয় প্রার্থীরই রয়েছে সুনাম। তবে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা কাকে সমর্থন করবেন–তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
টাঙ্গাইল-৩ আসনে নাসির বনাম আজাদ
টাঙ্গাইল-৩ আসনটি ঘাটাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির।
তার বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লুৎফর রহমান আজাদ। অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী হিসেবে এলাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। অতীতে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তার প্রতি আস্থাশীল।
ফলে এই আসনেও বিএনপির নেতাকর্মীরা নাসির ও আজাদ–এই দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গেছেন।
টাঙ্গাইল-৮ আসনে আজম খান বনাম রাসেল
টাঙ্গাইল-৮ আসনটি সখিপুর ও বাসাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত। দীর্ঘদিন ধরেই এই আসনটি আলোচিত ছিল বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে কেন্দ্র করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কাদেরিয়া বাহিনী গঠন করে তিনি এই অঞ্চলে আলাদা রাজনৈতিক মর্যাদা তৈরি করেছিলেন।
আওয়ামী লীগে থাকা ও পরে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ প্রতিষ্ঠার পরও কাদের সিদ্দিকী ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে এবার তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না এবং নির্বাচন থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন।
এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান। তিনি কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিত। আয়কর আইনজীবী হিসেবে সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন লাবিব গ্রুপের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল। যদিও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী, তবে বিএনপি ঘরানার ব্যক্তি হিসেবেই এলাকায় পরিচিত।
সমাজসেবক ও দলীয় ডোনার হিসেবে সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেলের রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। স্থানীয়দের মতে, এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।


