পাটবোঝাই নৌকাসহ বিএসএফের হাতে ৫ বাংলাদেশি, পরিবারে উৎকণ্ঠা

পদ্মায় পথ ভুল করে ভারতের সীমান্তে ঢুকে পড়ার দাবি, পাঁচ দিনেও মেলেনি ফেরার খবর

পাটবোঝাই নৌকাসহ বিএসএফের হাতে ৫ বাংলাদেশি, পরিবারে উৎকণ্ঠা
বিএসএফের হাতে আটক পাঁচ বাংলাদেশি। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

পাঁচ দিন ধরে ছেলের অপেক্ষায় আছেন গোলাম মোস্তফা। একইভাবে স্বামী, বাবা কিংবা ভাইয়ের ফিরে আসার পথ চেয়ে আছেন আরও চার পরিবারের সদস্যরা। কবে তারা ফিরবেন, কোথায় আছেন, কেমন আছেন—কোনো প্রশ্নেরই নিশ্চিত উত্তর নেই স্বজনদের কাছে। তাদের দাবি, পদ্মা নদীতে পথ ভুল করে ভারতীয় সীমান্তে ঢুকে পড়ার পর বিএসএফ পাটবোঝাই নৌকাসহ পাঁচ বাংলাদেশিকে আটক করে নিয়ে গেছে। এরপর থেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারগুলোর।

গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাংলাবাজার চর এলাকা থেকে পাট কিনে নৌকায় বাড়ি ফেরার সময় এ ঘটনা ঘটে বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্বজনদের দাবি, রাতের অন্ধকারে নদীর স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানোর সময় পথ ভুল করে নৌকাটি ভারতীয় সীমান্তের দিকে চলে যায়। পরে বিএসএফ নৌকাসহ পাঁচজনকে আটক করে।

আটক ব্যক্তিরা হলেন বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর মধ্যপাড়া গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে কলেজছাত্র মোশাররফ হোসেন (২৬), ইউনুছ আলীর ছেলে সাহাবুল আলী (৪০), শাহাজাহান প্রামাণিকের ছেলে বাবর আলী (৪০), সামাদ মণ্ডলের ছেলে নৌকার মাঝি সাইফুল ইসলাম (৪৬) এবং জামাল মণ্ডলের ছেলে নৌকার মাঝি আশাদুল ইসলাম (৩৮)। তাদের মধ্যে তিনজন পাট ব্যবসায়ী এবং দুজন নৌকার মাঝি।

ঘটনার পর স্বজনরা আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পে যোগাযোগ করেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। তবে বৈঠকের পরও আটক ব্যক্তিদের ফেরত আনার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান হয়নি।

আশাদুল ইসলামের ভাই সাহারুল ইসলাম বলেন, পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, ভুল করে ভারতীয় সীমান্তে ঢুকে পড়ায় পাটবোঝাই নৌকাসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তবে তাদের কোথায় রাখা হয়েছে বা কী অবস্থায় আছেন, সে বিষয়ে পরিবারকে নিশ্চিতভাবে কিছু জানানো হয়নি।

আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার নায়েক সুবেদার মুনছুর আলী বলেন, ‘এ বিষয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক হয়েছে। নৌকাটি ভুল করে ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে চলে গিয়েছিল।’

বিজিবির মিডিয়া সেলের সিপাহী সাকিব মুঠোফোনে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

শনিবার আটক ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও হতাশা বিরাজ করছে। কয়েক দিন ধরে কোনো খবর না পাওয়ায় তাদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। পরিবারের সদস্যদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন আটক ব্যক্তিরা কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন, তা নিয়ে।

কলেজছাত্র মোশাররফ হোসেনের বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘অভাবের সংসারে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছেলে পাটের ব্যবসা করত। এবার আরও দুজন পার্টনারের সঙ্গে পাট কেনাবেচা করছিল। ছেলেটা কোথায় আছে, কেমন আছে—কিছুই জানি না।’

নৌকার মাঝি আশাদুল ইসলামের মেয়ে বৈশাখী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। বাবা ছাড়া আমাদের সংসার চালানোর মতো আর কেউ নেই। এই কয়দিন আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে সংসার চলছে। এভাবে কত দিন চলব?’

আটক বাবর আলীর স্ত্রী হেলেনা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী কোথায়, কী অবস্থায় আছে—এটুকু জানতে পারলেও কিছুটা শান্তি পেতাম। আমরা খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’

স্থানীয়দের দাবি, আটক পাঁচজনই এলাকায় পাট ব্যবসা ও নৌকা চালানোর সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে মাদক বা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ নেই বলেও তারা দাবি করেন। ভুলবশত সীমান্তের ওপারে চলে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মানবিক দিক থেকে তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পাকুড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাঘা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফকরুল হাসান বাবলু বলেন, ‘এরা গরিব মানুষ। ভুল করে সীমান্তের ওপারে চলে গেছে। দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা উচিত।’

বিষয়টি রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদকে জানানো হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। তাদের দাবি, সংসদ সদস্য বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডারের সঙ্গে কথা হয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পাঁচ বাংলাদেশির পরিবার এখন স্বজনদের নিরাপদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এবং দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের প্রত্যাশায় দিন কাটছে পরিবারগুলোর। সীমান্ত পর্যায়ের যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এই অনিশ্চয়তার অবসান চান স্বজনরা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর