নাইজারের রাজধানী নিয়ামেতে দেশটির বৃহত্তম বিমানবন্দরে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে বন্দুকধারীরা। এ ঘটনায় ১১ সেনা সদস্যসহ ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহত অন্যরা দুজন বেসামরিক নাগরিক ও ২২ জন হামলাকারী।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে এ ঘটনা ঘটে। পরে সন্ধ্যায় আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠন জামাত নুসরত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম) এই হামলার দায় স্বীকার করে।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির বাসিন্দারা জানান, রাজধানী নিয়ামেতে দিওরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়, তখন তারা মাত্রই তাদের সকালের নামাজ শেষ করেছিলেন।
নাইজার গত এক দশক ধরে ইসলামপন্থী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। গত জানুয়ারি মাসেও ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠন একই বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
বৃহস্পতিবার সকালের দিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং এরপর থেকে নিরাপত্তা বাহিনী বাকি হামলাকারীদের খোঁজে চিরুনি অভিযান শুরু করে।
বিমানবন্দরের কাছে বসবাসকারী লাওয়ালি সালহা বলেন, ‘আমরা ভোর আনুমানিক ৫টা ৫০ মিনিটে নামাজ শেষ করি এবং এর কিছুক্ষণ পরই একটি বিকট শব্দ শুনতে পাই—মনে হচ্ছিল যেন কিছু একটা বিস্ফোরিত হয়েছে, সম্ভবত কোনো টায়ার। তার কিছু সময় পর বুঝতে পারি আসলে কী ঘটছিল।’
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহত ২২ হামলাকারী ছাড়াও আরও চারজন আহত হয়েছে। তারা আরও যোগ করেন, ২০ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অভিযানস্থল থেকে আরপিজি-৭ লঞ্চার, একে-৪৭ রাইফেল, বিস্ফোরক, গ্রেনেড, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং হাজার হাজার রাউন্ড গোলাবারুদসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অস্ত্রধারী স্থানীয় বাসিন্দারাও হামলাকারীদের খোঁজে তল্লাশিতে যোগ দেন, যদিও প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা কর্মীরা বেসামরিক লোকদের এতে জড়িত হতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাসিন্দা বলেন, ‘হামলাকারীরা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, তাই তাদের খুঁজে বের করা সহজ ছিল না। বেসামরিক নাগরিকেরা নিজেদের রক্ষা করতে এবং তাদের সামনে আসা যেকোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে প্রতিহত করতে দা ও লাঠি তুলে নিয়েছিল।’
বৃহস্পতিবার বিকালে বিমানবন্দর এলাকা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং নিরাপত্তা বাহিনী ওই এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়া যানবাহনগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছিল।
আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের চেয়ারম্যান মাহমুদ আলি ইউসুফ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি নাইজেরীয় বাহিনীর প্রশংসা করে বলেছেন, তাদের তৎপরতার কারণেই ‘হামলা প্রতিহত করা এবং বিমানবন্দর এলাকা সুরক্ষিত করা সম্ভব হয়েছে।’
দিওরি হামানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি নাইজারের অন্যতম সংবেদনশীল নিরাপত্তা স্থাপনা, যা একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কেন্দ্র এবং সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এটি ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ (এইএস)-এর সঙ্গে যুক্ত সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করে, যার মধ্যে নাইজার এবং তার প্রতিবেশী দেশ মালি ও বুর্কিনা ফাসো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই তিনটি দেশই বর্তমানে সামরিক জান্তা দ্বারা শাসিত হচ্ছে, যারা মূলত ওই অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে চলা জিহাদি সহিংসতা মোকাবিলায় পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থতার জেরে ক্ষমতায় এসেছিল।
নাইজারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত জানুয়ারিতে বিমানবন্দরে হওয়া হামলায় চারজন সামরিক কর্মী আহত হয়েছিলেন এবং ২০ জন হামলাকারী নিহত হয়েছিলেন।
সেই সময়, তিন বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা নাইজারের সামরিক সরকারের প্রধান আবদুরাহামানে তিয়ানি এই হামলা নস্যাৎ করতে সহায়তার জন্য রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ফ্রান্স, বেনিন ও আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধে এই হামলায় জড়িতদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তবে রাশিয়া কী ধরনের সহায়তা দিয়েছিল সে বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি, কিংবা অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে তার আনা অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণও উপস্থাপন করেননি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, নাইজারের কর্তৃপক্ষ “সন্ত্রাসী ঝুঁকির” কথা উল্লেখ করে বিমানবন্দরের কাছাকাছি বেশ কিছু এলাকা গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
এএফপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীর আরও বাড়িয়েছে এবং সেখানে ৩৫০টিরও বেশি নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করেছে।


