তিন্দু পাহাড়ে স্কুল টিকল, শিক্ষক টিকবেন তো?

তিন্দু পাহাড়ে স্কুল টিকল, শিক্ষক টিকবেন তো?
ছবি: তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সৌজন্যে
Advertisement
Advertisement

বান্দরবান থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার সড়কপথ, এরপর সাঙ্গু নদীর বুক চিরে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আরও প্রায় দেড় ঘণ্টার যাত্রা; ঘাটে নেমে আরও কিছুদূর পাহাড়ি আঁকাবাঁকা হাঁটাপথ। এভাবেই পৌঁছাতে হয় থানচি উপজেলার দুর্গম তিন্দু পাহারাঞ্চলে। সেই দুর্গম পাহাড়ের বুকেই একটি পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে প্রায় অর্ধযুগ ধরে নিম্নমাধ্যমিকের পাঠ নিচ্ছেন পাহাড়ি শিশুরা।

স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন জাতীয়করণের পথে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার খবর পৌঁছাতে আনন্দের জোয়ার এসেছে তিন্দুর পাহাড়ি জনপদ। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মনে।

যে শিক্ষকেরা প্রায় অর্ধযুগ ধরে বিনা বেতনে বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রেখেছেন, জাতীয়করণের পর সেখানে তাদের জায়গা হবে তো? কারণ দুর্গম পাহাড়ের স্থানীয় এই শিক্ষকরা সবাই স্নাতক সনদধারী হলেও কারোরই শিক্ষকতার জন্য নিবন্ধনের সনদ নেই।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মূলত তিন্দু বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের পর টিনশেড ঘরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ২০২০ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে সেই পরিত্যক্ত ঘরেই শুরু হয় নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা। এরপর স্থানীয় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা স্বেচ্ছায় শিক্ষার্থীদের পড়ানো শুরু করেন। ফলে ক্রমেই বাড়তে শুরু করে শিক্ষার্থী। বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষক বিদ্যালয়টির ৫৬ জন শিক্ষার্থীকে নিয়মিত পাঠদান করছেন।

একসময় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভাবে তিন্দু এলাকার অধিকাংশ শিশুর পড়াশোনাই থেমে যেত। পাহাড়, নদী আর দুর্গম বনপথ অতিক্রম করে দূরের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ কিংবা সামর্থ্য ছিল না অধিকাংশ পরিবারের। এরকম পরিস্থিতিতে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মং প্রু অং মারমার উদ্যোগে স্থানীয়রা পরিত্যক্ত ঘরটিতে মাধ্যমিক বিদ্যালয় চালুর সিদ্ধান্ত নেন। দায়িত্ব দেওয়া হয় রেমাক্রি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াংকে। কিন্তু বিদ্যালয় চালানোর মতো অর্থ ছিল না।

আরও পড়ুন

বর্তমান চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘থানচি উপজেলা পরিষদ থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই নৌকা ভাড়া দিয়ে বিদ্যালয়ের কিছু ব্যয় মেটানো হতো। প্রয়োজন হলে প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং নিজেই নৌকাটি চালিয়ে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতেন।’

শিক্ষকের এই নৌকা চালানোর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে জাতীয় সংসদে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই খবরে উল্লাস প্রকাশ করেছেন তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে স্কুলটি এখন দাঁড়িয়ে যাবে। এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকার হাজারো মানুষের জন্য এটি অনেক বড় খুশির খবর।’

কিন্তু এতদিনের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন হবে কি না তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সহকারী শিক্ষক পাওং ম্রো। তিনি বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে শিক্ষকতা করছি। বিনা বেতনে পড়িয়েছি। এখন শুনছি, স্কুল জাতীয়করণ হলে আমরা বাদ পড়ে যাব।’

একই প্রশ্ন শিক্ষিকা কাইন খুমীরও–‘আমাদের যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ দিয়ে চাকরিতে রাখার বিষয়টি সরকার কি বিবেচনা করবে?’

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন শুধু এনটিআরসি-এর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। নিবন্ধন ছাড়া জাতীয়করণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন শিক্ষক হিসেবে থাকার সুযোগ নেই।’

তবে দুর্গম অঞ্চল বিবেচনায় সরকার চাইলে এরকম প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতিগতভাবে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের ওপর নির্ভর করছে বলেও জানান তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad