জীবন গড়ে নদী

জীবন গড়ে নদী
ছবি: টাইমস/ সৈয়দ মাহামুদুর রহমান।
Advertisement
Advertisement

চাঁদপুরের মতলবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নদীকে ঘিরেই জেলেদের জীবন। নৌকা, জাল আর মাছ ধরার অভিজ্ঞতা তাদের জীবিকার অবলম্বন। কিন্তু বদলে যাওয়া নদীতে মাছের পরিমাণ কমছে, বাড়ছে অনিশ্চয়তা। তবু প্রতিদিন সকালে জাল কাঁধে নদীর দিকে ছুটে যান তারা। কারণ, নদী শুধু তাদের আয়ের উৎস নয়, তাদের পরিচয়, স্মৃতি আর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ছবি: টাইমস/ সৈয়দ মাহামুদুর রহমান।

চাঁদপুরের মতলবে ভোর কিংবা দিনের অন্য কোনো সময়ে জেলেরা নৌকা ঠেলে নদীতে নামান। জাল ফেলেন, তারপর অপেক্ষা করেন। কখনো জালে ওঠে প্রত্যাশিত মাছ, কখনো দীর্ঘ সময় নদীতে কাটিয়েও ফিরতে হয় অল্প মাছ নিয়ে। দিন শেষে কতটা মাছ পাওয়া গেল, কত ঘণ্টা নদীতে কাটাতে হলো আর সংসারের জন্য কত টাকা ঘরে নেওয়া যাবে, এসব হিসাবেই ধরা পড়ে নদীর বদলে যাওয়ার প্রভাব।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার পরিবারগুলোর জীবন আবর্তিত হয়েছে নদীকে ঘিরে। নদীর স্রোত, ঋতুর পরিবর্তন, মাছের আনাগোনা; সবকিছুই তারা শিখেছেন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে পেয়েছেন নৌকা, জাল আর মাছ ধরার কৌশল। সেই অভিজ্ঞতাই তাদের জীবিকার ভিত্তি, সেই নদীই তাদের কর্মস্থল।

কিন্তু যে নদীর সঙ্গে তাদের জীবনের এত নিবিড় সম্পর্ক, সেই নদীই এখন বদলে যাচ্ছে। জেলেদের অভিজ্ঞতায়, নদীতে মাছের পরিমাণ কমছে। পানির অবস্থা ও মাছের আচরণেও তারা পরিবর্তন লক্ষ করছেন। ফলে প্রতিদিনের মাছ ধরার কাজটি হয়ে উঠছে আরও অনিশ্চিত।

সারাদিন পরিশ্রম করেও সব সময় পরিবারের ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না। আগে থেকেই সীমিত আয়ে চলা পরিবারগুলোর জন্য মাছের পরিমাণ সামান্য কমে যাওয়াও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। জালে মাছ কম উঠলে সংসারের খরচ মেটাতে  হিসাব-নিকাশ করতে হয় আরও বেশি। দীর্ঘ সময় নদীতে কাটিয়েও প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ার অর্থ, শ্রমের তুলনায় আয় কমে যাওয়া।

ছবি: টাইমস/ সৈয়দ মাহামুদুর রহমান।

তারপরও জেলেরা নদীতে যান। কারণ, জীবিকার বিকল্প খুব বেশি নেই তাদের। মাছ ধরা তাদের কাছে কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি এই জনপদের মানুষের পরিচয়ের অংশ। নদীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে কাজের মধ্য দিয়ে, পারিবারিক অভিজ্ঞতায় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জীবনযাপনের ধারায়।

নদীর পাড়ে তাই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জীবনের নানা আয়োজন। নদী থেকে মাছ নিয়ে আসা হয় বাজারে। সেখানে মাছ বাছাই করা হয়, চলে বেচাকেনা। নদীর পাশে কেউ গোসল করেন, কেউ দৈনন্দিন কাজ সারেন, আবার কেউ পরিচিত মানুষের সঙ্গে মিলিত হন। যে পানি জেলেদের জীবিকা জোগায়, সেই পানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনও। নদী তাদের খাবার ও আয়ের উৎস, একই সঙ্গে সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই পরিবেশেই বড় হয়ে ওঠে শিশুরা। তারা দেখে, কীভাবে তাদের মা-বাবা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালান। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জীবনযাপন, কাজের ধরন ও অভিজ্ঞতা তাদের শৈশবের অংশ হয়ে থাকে। এভাবেই মাছ ধরার পেশা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।

আরও পড়ুন

কিন্তু এই জীবনের সঙ্গে এখন ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে অনিশ্চয়তা। মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি নদীতে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর কারও কারও ত্বকে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। পানির পরিবর্তন তাদের জীবিকায় যেমন প্রভাব ফেলছে, তেমনি নদীর সঙ্গে প্রতিদিনের সংস্পর্শ নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।

এই পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে নদীর তীরে বসবাসকারী মানুষের কাছে বড় কোনো পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না। তাদের অভিজ্ঞতাই বলে দেয় নদী কতটা বদলেছে। জালে মাছ কম ওঠা, বাজারে মাছের ছোট ঝুড়ি দেখা কিংবা দীর্ঘ সময় নদীতে কাটিয়ে অল্প মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরা, এসবই তাদের কাছে পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র।

ছবি: টাইমস/ সৈয়দ মাহামুদুর রহমান।

মতলবের মেঘনা বৃহত্তর একটি আন্তসংযুক্ত নদীব্যবস্থার অংশ। ঢাকার বুক দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গাও এই নদীব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। কয়েক দশক ধরে বুড়িগঙ্গায় অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য ও নগরীর অন্যান্য দূষিত পদার্থ মিশছে। নদীর পানি এক জায়গায় আটকে থাকে না। এক নদী থেকে অন্য নদীতে প্রবাহিত হয়, যুক্ত করে এক জনপদের সঙ্গে আরেক জনপদকে। ফলে উজানের নদীগুলোতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের প্রভাবও সব সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

নদী ও পানির এই আন্তসংযোগের প্রভাব জেলেদের জীবনে কীভাবে এসে পড়ে, তা তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের কাছে নদীর পরিবর্তন কোনো প্রতিবেদন বা পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এটি জীবিকার প্রশ্ন, পরিবারের খরচ মেটানোর প্রশ্ন, প্রতিদিনের শ্রমের বিনিময়ে কতটা আয় হবে, সেই প্রশ্ন।

তবু পরদিন সকালে তারা আবার নদীতে যান। নৌকা নিয়ে পানিতে নামেন, জাল ফেলেন, অপেক্ষা করেন। নদী থেকে কিছু মাছ পাওয়ার আশা নিয়েই শুরু হয় নতুন দিন। দীর্ঘদিন ধরে যে নদী তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই নদীর ওপর নির্ভরতা থেকে সরে আসা তাদের জন্য সহজ নয়।

নদীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল জীবিকার নয়। এই নদীর সঙ্গে মিশে আছে পরিবারের স্মৃতি, পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা এবং পরিচিত জীবনযাপনের ইতিহাস। সারা জীবন তারা শিখেছেন নদীর স্রোত, ঋতু আর বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতে হয়। এখন তাদের শিখতে হচ্ছে, বদলে যাওয়া নদীকে নিয়েই কীভাবে টিকে থাকতে হবে।

কিন্তু মানিয়ে নেওয়ার এই চেষ্টা কতটা সহজ, তা বোঝা যায় তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামে। মাছ কমে গেলে আয় কমে, আর আয় কমলে সীমিত সামর্থ্যের সংসারে নতুন করে হিসাব মেলাতে হয়। তারপরও নদী ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের জন্য সহজ কোনো পথ নয়। কারণ, নদীর বাইরে জীবিকার বিকল্প সীমিত হলেও নদীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বহু প্রজন্মের।

ছবি: টাইমস/ সৈয়দ মাহামুদুর রহমান।

মতলবের জেলেদের কাছে নদী তাই একই সঙ্গে জীবিকার উৎস ও কঠিন চ্যালেঞ্জ। এটি তাদের কর্মস্থল, খাবার ও আয়ের অবলম্বন। একই সঙ্গে এটি তাদের বাড়ি, এমন এক পরিচিত আশ্রয়, যা ছেড়ে যাওয়া সহজ নয়। অথচ সেই নদীই ক্রমে হারিয়ে ফেলছে তার চেনা রূপ।

পানি বয়ে চলে। তার সঙ্গে প্রবাহিত হয় পলি, শহরের বর্জ্য আর নদীপারের মানুষের বেঁচে থাকার আশা। আর প্রতিদিন সকালে মতলবের জেলেদের নৌকাগুলো আবার নদীর দিকে এগিয়ে যায়। নদী বদলাচ্ছে, অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তবু থেমে নেই তাদের মাছ ধরার চেষ্টা।

কারণ, এই নদীর সঙ্গে তাদের জীবনের বন্ধন গভীর, আর সব পরিবর্তনের পরও নদীই এখনো তাদের প্রধান অবলম্বন।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad