বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। অথচ ১৯৭০ সালের পর বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে ৭৩ শতাংশ কমেছে। জীববৈচিত্র্য বিপর্যয় ঠেকাতে খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন জরুরি বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ)।
ডব্লিউডব্লিউএফ বলছে, খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন প্রকৃতি রক্ষায় পরবর্তী ‘ইতিবাচক মোড়’ তৈরি করতে পারে।
বন্য বাঘ, ব্লুফিন টুনা ও সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপের সংখ্যা পুনরুদ্ধারের উদাহরণ দেখিয়ে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কার্যকর উদ্যোগ নিলে প্রকৃতির ক্ষয় ঠেকানো সম্ভব।
ডব্লিউডব্লিউএফ প্রায় ৩৬ হাজার প্রাণীর জনসংখ্যা ও ৫ হাজারের বেশি প্রজাতির তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এতে মেরুদণ্ডী বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে বড় তথ্যভান্ডার তৈরি হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭০ সালের পর প্রাণীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গড়ে ৭৩ শতাংশ কমেছে। এতে প্রকৃতির ‘উদ্বেগজনক মাত্রায় অবক্ষয়’ অব্যাহত থাকার চিত্র উঠে এসেছে। ক্ষয় কমারও কোনো লক্ষণ নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃতির ক্ষয় এখন পরিবেশগত সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও সরাসরি হুমকি। ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ প্রায় ৫৮ ট্রিলিয়ন ডলার, প্রকৃতি ও এর বাস্তুতান্ত্রিক সেবার ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা ও মানুষের কল্যাণের জন্য অস্তিত্বের হুমকি’ তৈরি করেছে।
বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অঞ্চলে প্রাণীর সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত কমছে। উত্তর গোলার্ধের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এ প্রবণতা তুলনামূলক কম।
১৯৭০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে স্থল ও মিঠাপানির বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে ৯৫ শতাংশ কমেছে। আফ্রিকায় কমেছে ৮০ শতাংশ। ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় কমেছে ২৩ শতাংশ।
সব বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে মিঠাপানির প্রাণীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে। নদী ও হ্রদে পর্যবেক্ষণ করা প্রাণীর সংখ্যা গড়ে ৮৫ শতাংশ কমেছে। স্থলভাগের প্রাণীর সংখ্যা কমেছে ৬৯ শতাংশ। সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা কমেছে ৫৯ শতাংশ।
ডব্লিউডব্লিউএফ যুক্তরাজ্যের প্রধান নির্বাহী তানিয়া স্টিল বলেন, ‘প্রকৃতির ক্ষতি শুধু বন্যপ্রাণীর সংকট নয়। এটি ইতোমধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, পানির সরবরাহ, অর্থনীতি ও জলবায়ুজনিত ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন একটি মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে প্রকৃতির ক্ষতির ক্রমবর্ধমান মূল্য দিতে হবে। অন্যদিকে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ করে এমন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণী একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্য কমলেও বন্য বাঘ, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ ও ব্লুফিন টুনার সংখ্যা বাড়ছে। এতে প্রমাণ হয়, কার্যকর উদ্যোগ নিলে বৈশ্বিক প্রকৃতির ক্ষয় উল্টে দেওয়া সম্ভব।
২০১০ সালে বিশ্বে বন্য বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার ২০০। তখন প্রজাতিটি বিলুপ্তির দিকে এগোচ্ছিল। দীর্ঘমেয়াদি ও লক্ষ্যভিত্তিক সংরক্ষণ উদ্যোগের পর বাঘের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ হয়েছে। অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডব্লিউডব্লিউএফ যুক্তরাজ্যের বাঘ সংরক্ষণবিষয়ক প্রধান বেচি ডে বলেন, ‘বন্য বাঘের এই প্রত্যাবর্তন ‘আশার বিজ্ঞান’-এর অসাধারণ উদাহরণ। জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিবর্তন সম্ভব, এটি তার প্রমাণ।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে কয়েক দশক ধরে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের ব্লুফিন টুনার সংখ্যা দ্রুত কমছিল। এখন উভয় প্রজাতিই এমন পর্যায়ে ফিরে এসেছে যে কোনোটি আর হুমকির মুখে থাকা প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।
গত বছর সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রথম সামুদ্রিক কচ্ছপ হিসেবে আইইউসিএনের লাল তালিকায় ‘বিপন্ন’ শ্রেণি থেকে ‘ন্যূনতম উদ্বেগের’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। প্রায় ৮০টি দেশে ৫০ বছর ধরে সমন্বিত সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফল হিসেবে এ পরিবর্তন এসেছে।
ডব্লিউডব্লিউএফ যুক্তরাজ্যের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ও প্রতিবেদনের সহলেখক মাইক ব্যারেট বলেন, ‘এসব উদাহরণ দেখায়, প্রকৃতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও পুনরুদ্ধার সম্ভব। এগুলো আমাদের আশাবাদী করে। তবে প্রকৃতির ওপর থাকা হুমকির মাত্রা মোকাবিলায় শুধু সংরক্ষণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়।’
তিনি বলেন, নেতিবাচক ‘টিপিং পয়েন্ট’ অতিক্রম করলে প্রকৃতির পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকবে না। টিপিং পয়েন্ট হলো এমন স্বয়ংক্রিয় ও অপরিবর্তনীয় পরিবেশগত পরিবর্তন, যা জলবায়ু সংকটকে আরও তীব্র করে।
ব্যারেটের মতে, প্রকৃতির ক্ষতি বাড়িয়ে দেওয়া ব্যবস্থাগুলো পরিবর্তন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, খাদ্য ও অর্থব্যবস্থা।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি খাতে আমরা ইতোমধ্যে ইতিবাচক টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করেছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এই পরিবর্তন এখন আর থামানো যাবে না। তবে পরিবর্তনের গতি যথেষ্ট নয়।’
ব্যারেট বলেন, মানবজাতিকে খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষি আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় কারণ। এতে জীববৈচিত্র্যও কমছে। কৃষি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের বড় উৎস। এটি জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
গ্লোবাল সিস্টেমস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও প্রতিবেদনের সহলেখক স্টিভ স্মিথ বলেন, ‘প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে টেকসই ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুললে। তবে ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই খাতই বর্তমানে সবচেয়ে পিছিয়ে। বিশ্বজুড়ে বন উজাড়ের প্রায় ৯০ শতাংশের প্রধান চালিকাশক্তি কৃষির সম্প্রসারণ।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


