রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া ৪০ ফুট খাল পুনরুদ্ধারে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ১০ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন ৪০০-এর বেশি স্বেচ্ছাসেবক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। খাল থেকে বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা কমানো, ডেঙ্গুর ঝুঁকি হ্রাস এবং আশপাশের পরিবেশের উন্নয়ন এ অভিযানের মূল লক্ষ্য।
ফুটস্টেপ্স বাংলাদেশের উদ্যোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সহযোগিতায় কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে। খালের ভেতরের বর্জ্য পরিষ্কারের পাশাপাশি পাড় ও সংলগ্ন রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন করা, পাশের দেয়ালে চিত্রাঙ্কন এবং দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে পড়ে থাকা একটি সেতু মেরামতের কাজও এর আওতায় নেওয়া হয়েছে।
বসিলার ৪০ ফুট এলাকার এ খালটি দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে আছে। এতে পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বর্ষাকালে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। দূষিত পরিবেশে দুর্গন্ধ ও মশার বিস্তার বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। খালটি মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার সঙ্গে তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীর সংযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অভিযানের প্রথম দিন সকাল থেকেই খাল পরিষ্কারের কাজে অংশ নেন ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। স্বেচ্ছাসেবকেরা খালের পাড়, সংলগ্ন সড়ক ও আশপাশের এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালান। তাদের মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ৫০ জন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকর্মী সরাসরি খালের ভেতরে কাজ করছেন।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, খালে নিয়মিত বর্জ্য জমতে থাকায় একবার পরিষ্কার করে চলে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এ কারণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকদের ভাষ্য, কর্মসূচির উদ্দেশ্য শুধু খাল থেকে বর্জ্য সরানো নয়; বরং এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা। ডিএনসিসির সহযোগিতায় অপসারিত বর্জ্য সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে সেগুলো খালের পাড়ে জমে থেকে পুনরায় দূষণ ছড়াতে না পারে।
খাল ও আশপাশের এলাকার পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি সংলগ্ন অবকাঠামো সংস্কারেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খালের পাশের দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের চিত্রাঙ্কনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে পড়ে থাকা একটি সেতুর মেরামতকাজ শুরু হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সঙ্গে এসব উদ্যোগ যুক্ত করার মাধ্যমে এলাকার পরিবেশ ও অবকাঠামোগত অবস্থার উন্নয়ন করতে চায় আয়োজকেরা।
ফুটস্টেপ্স বাংলাদেশের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট শাহ রাফায়েত চৌধুরী বলেন, ‘একটি পরিষ্কার খাল মানে শুধু বর্জ্য সরানো নয়। এটি মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, জলাবদ্ধতা প্রতিরোধ করে এবং এলাকাবাসীকে একটি প্রাণবন্ত জলপথ ফিরিয়ে দেয়।’
নগরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে খালের ভূমিকার পাশাপাশি এ ধরনের কর্মসূচিতে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে খাল ও জলপথ সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করা অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ময়লা-আবর্জনা জমার প্রবণতা বেশি। খাল ও আশপাশের পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন থাকলে মশার বিস্তার এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে খাল পরিষ্কার রাখা ও আশপাশের বর্জ্য অপসারণকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর উত্তর অংশে খাল পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের ধারাবাহিকতায় বসিলার এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে।
খালগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখাই এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য। পাশাপাশি খাল পুনরুদ্ধার ও খননসংক্রান্ত সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও এ ধরনের কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযানের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
‘খাল ফিরুক আপন ছন্দে, শহর থাকুক আনন্দে’ এ বার্তা সামনে রেখে খাল সংরক্ষণে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে আয়োজকরা।


