বিউটি বোর্ডিং থেকে মাত্র এক মিনিটের পথ। ইতিহাস খুঁজলে হয়তো পুরান ঢাকার নর্থব্রুক হল রোডের এই জায়গাটির সঙ্গে ঠিকই যোগসূত্র পাওয়া যাবে বিশ শতকের গোড়ার দিকের ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের।
মজার ব্যাপার হলো, অসহযোগ আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত প্রগতিশীল বাঙালিদের সান্ধ্য আড্ডার সম্ভাব্য এই ঠিকানায় এখনো পরিবেশন করা হয় ঔপনিবেশিক স্বাদের খাবার। একবার ভাবুন তো, মচমচে চিকেন কাটলেটে কামড় দিতে দিতে প্রতিবাদের পরিকল্পনা করছেন বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে, তাহলে কেমন লাগবে!
প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়েছে, এখনও বেশ জমজমাট এ রেস্তোরাঁ। এখন এর নাম ‘নিউ ক্যাফে কর্নার’। খাদ্যরসিক বা পেটুক—দুই ধরনের মানুষেরই ভিড় এখানে। তবে আমি নিশ্চিত, এখন আর এখানে বিদ্রোহের কোনো ছক আঁটা হয় না।
শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে অক্টোবর। বাতাসে মিশে থাকে শরতের শুরুর প্রাণচাঞ্চল্য। শহরের এই অংশে সন্ধ্যা নামলে তাই প্রায়ই ক্যাফে কর্নারে ঘণ্টাখানেক কাটানো হয়, সঙ্গে থাকে কাটলেট কিংবা সদ্য ভাজা কোনো মুখরোচক খাবার।
১৯৭২ সাল থেকে এই ক্যাফেতেই কাজ করছেন, এমন এক ওয়েটারের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, আগের মালিকেরা ক্যাফেটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এরপরই মূল নামের সঙ্গে ‘নিউ’ শব্দটি যোগ করা হয়।
সাইনবোর্ডে মূল নামের ওপরে বাড়তি শব্দটি লেখা হয়েছে বটে, তবে সাধারণত তা কারও চোখে পড়ে না। কারণ, যারা এখানে আসেন, তাদের মনে গেঁথে আছে সেই পুরোনো নামটিই।
পুরান ঢাকায় অবস্থিত এই ক্যাফে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার অন্যতম আকর্ষণ। ভিক্টোরিয়া পার্ক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও সিএমএম আদালত থেকে রিকশায় যেতে প্রায় ১০ মিনিট লাগে।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বিকালের শেষ ভাগ থেকেই কানায় কানায় ভরে যায় ক্যাফেটি। ফলে টেবিল খালি হওয়ার অপেক্ষায় তখন আমরা দাঁড়িয়ে বাইরে।
ভিড় ঠেলে বসার পর খেয়াল করলাম, প্রতিবার খাবারের সঙ্গে কাঠের হাতলওয়ালা ছুরি-কাটা চামচ দেওয়া হচ্ছে। যেন বিস্মৃত এক শতাব্দীর আরেক রীতি, ঝকঝকে ছুরি-কাটাচামচ সঙ্গে সদ্য ওভেন থেকে বের করা খাবার।
সাধারণত এখানকার বিখ্যাত কাটলেট খাওয়ার জন্যই ভিড় জমে বেশি। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পেয়ে যেতে পারেন লবস্টারও। অবশ্য তা নির্ভর করে পাশের নদীতে কী ধরা পড়ল, তার ওপর।
পুরান ঢাকায় লবস্টার! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আর অর্ডার দিতে দ্বিধা করবেন না। যা আশা করছেন, তা-ই পাবেন—ভাজা লবস্টার।
সত্তরের দশকের কবিতা ও ছোটগল্পেও ক্যাফে কর্নারের উল্লেখ আছে। যদিও ঢাকাজুড়ে এত এত ঝাঁ-চকচকে খাবারের দোকান গড়ে ওঠায় কিছুটা ম্লান হয়েছে এই জায়গাটির আকর্ষণ। তারপরও ধানমন্ডি থেকে আসা এক ক্রেতার মতে, ‘এখানকার পরিবেশ আর পুরোনো দিনের মায়াময় আকর্ষণে মাসে অন্তত একবার আসি।’
‘সত্যি বলতে, খাবারকে আমি ১০-এর মধ্যে ৬ দেব। কিন্তু এখানে পরিবেশিত বিশ শতকের গোড়ার দিকের খাবার, ছুরি-কাটাচামচ আর ইতিহাসমাখা পরিবেশ—সব মিলিয়ে সুস্বাদু এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেন পুরোনো সময়ে ফিরে যাই’ বলেন তিনি।
নিঃসন্দেহে, আগতদের স্মৃতিকাতর করে তোলার ক্ষমতাই পুরান ঢাকার এসব নিদর্শনকে এখনো জীবন্ত ও জমজমাট করে রেখেছে। যেমন কঠিন এক কর্মদিবস শেষে সিএমএম আদালতের আইনজীবীরাও এই ক্যাফেতে একটু জিরাতে আসেন।
শরতের শুরুর এক সন্ধ্যায় সামনে ভাজা লবস্টার নিয়ে বসে থাকতে থাকতে মনে একটি ছবি ভেসে উঠল। চা আর কাটলেটের আড্ডায় আইনজীবীরা তুমুল আলোচনা করছেন—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত এক অগ্নিঝরা বিপ্লবীর পক্ষে কীভাবে লড়বেন, তা নিয়ে।
যদিও ক্যাফের ওয়েটারের মতে, ক্যারামেল কাস্টার্ড পুডিংয়ের স্বাদ নিতে আমাদের শিগগিরই আরও একবার আসা উচিত।
আহা, সাম্রাজ্যের আরেক উত্তরাধিকার!
সাপ্তাহিক ছুটির দিন বিউটি বোর্ডিংয়ে কবিতা লিখে কাটানো, সন্ধ্যায় ক্যাফে কর্নারে নাশতা, তারপর ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ানো—বলা যায়, সবমিলে সেই পুরোনো দিনের ‘বাবু’ জীবনের স্বাদ পেয়েই গেলেন!


