জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার চার দিনের মাথায় চট্টগ্রামের নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে দাম বাড়ার চাপ দেখা দিয়েছে। এক সপ্তাহে বেশ কিছু সবজি, ডিম ও মুরগির দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গাজরের দাম।
১৮ সেপ্টেম্বর ৮০ টাকা কেজি দরের গাজর ২৫ সেপ্টেম্বর বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায়। কাঁচা মরিচের দামও বেড়ে ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়। চার দিন পর শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার, বহদ্দারহাট ও চকবাজার ঘুরে পণ্যের দাম বাড়ার এই চিত্র পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকে পণ্য আনতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে।
তবে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়ার অজুহাতে ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।
চার দিনে যেসব পণ্যের দাম বেড়েছে
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা ও অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের বাজারদরের সঙ্গে ২৫ সেপ্টেম্বরের দাম তুলনা করে দেখা গেছে, কয়েকটি পণ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
গাজর ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ কেজিতে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা বেড়েছে।
কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা হয়েছে। শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা হয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর বরবটি ৮০ থেকে ১২০ টাকা, শিম ১৪০ থেকে ২০০ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১৬০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১১০ টাকা, ঢেঁড়স ও পটল ৭০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ধনেপাতার দামও প্রায় ২০০ টাকা কেজিতে উঠেছে।
মাছের বাজারেও চড়া দাম
শুক্রবার রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা ও কোরাল ৬৩০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের দাম মানভেদে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
১৮ সেপ্টেম্বর পাঙাশ ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা ও বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাছের দাম শুধু পরিবহন খরচের ওপর নির্ভর করে না। সরবরাহ, আড়তদর ও মৌসুমি প্রাপ্যতাও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
ডিম-মুরগির দামও বেড়েছে
সপ্তাহের ব্যবধানে মুরগির দামও বেড়েছে। ব্রয়লার কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে।
সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা, লেয়ার ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা ও দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
ফার্মের লাল ডিম ডজনে ১০ টাকা বেড়ে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়।
গরুর মাংস ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
‘আগের টাকায় আর বাজার হয় না’
বহদ্দারহাটে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ আরিফ উদ্দিন বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও আমাদের বেতন বাড়েনি। আগে যে টাকায় পুরো সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন তা দিয়ে কয়েক দিনের বাজারও করা যাচ্ছে না।’
কাজীর দেউড়ি বাজারের এক ক্রেতা বলেন, ‘মাছ-মাংস ও সবজির দাম বেশি। তাই ডিম দিয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছিলাম। এখন ডিমের দামও বেড়েছে।’
পরিবহন খরচ বাড়ার কথা ব্যবসায়ীদের
রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকে মালামাল আনতে পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। আড়ত থেকে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই খুচরায়ও কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
সবজি বিক্রেতা শামসুল আলম বলেন, ‘পাহাড়তলী আড়তের দর ও সরবরাহের ওপর খুচরা বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল। আড়তে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।’
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি সরবরাহ ও আড়তদরের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে।
অযৌক্তিক দাম বাড়ালে ব্যবস্থা
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন বলেন, ‘অজুহাত দিয়ে পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ নেই। উৎপাদন, পাইকারি কেনা ও পরিবহনের প্রকৃত খরচ কতটা বেড়েছে, তা নজরদারি করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘কোনো ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে পারবে না। আমরা পণ্যের ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। ব্যবসায়ীদের যথাযথ কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে হবে ও যৌক্তিক মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোথাও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা ভোক্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’


