বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করার ক্ষেত্রে সহায়তা করার উদ্যোগ নেবেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
বৃহস্পতিবার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে এই বার্তা দিয়েছেন তিনি।
নতুন গভর্নর সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রবেশ করেন।
যোগদানপত্রে সই শেষে ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেন তিনি। আগামীতে কিভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক চলবে ও অর্থনীতি কিভাবে এগিয়ে নিয়ে নেবেন; সেসব বিষয়ে কর্মকর্তাদের সামনে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন মোস্তাকুর রহমান।
সভার পরে বেলা ২টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গভর্নরের পক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সভার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
তবে এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরদের একটি রেওয়াজে ছেদ পড়ল। সাধারণত প্রথম কর্মদিবসেই সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা।
মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমার কথাই গভর্নরের কথা। তার কথাই আমি বলতে এসেছি। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, তার হয়ে কথা বলতে।’
এসময় তিনি গভর্নরকে উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, ‘বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থনীতি গতিশীল করা ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
নতুন নিয়োগ পেয়েই বন্ধ কলকারখানা চালু করতে কেন উদ্যোগ নিতে চান গভর্নর এবং কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা জানতে চাইলে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কারখানা বন্ধ হলে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনীতিকে সচল করতে হলে তো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এজন্য কারখানাগুলোকে নীতি সহায়তা দেওয়া হবে।’
গভর্নরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এজন্য খেলাপী ঋণ পুনঃতফসিল ও কারখানা চালাতে চলতি মূলধন বাবদ নতুন ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মুখপাত্র বলেন, ‘ব্যক্তি দোষ করতে পারে; প্রতিষ্ঠান তো চালু করা যেতে পারে। এখানে অনেক কর্মসংস্থান জড়িত।’
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে শেখ হাসিনা ঘণিষ্ঠ অনেক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে যান, যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাংক লুট ও অর্থপাচারের অভিযোগ।
এস আলমসহ অনেকেই দেশ ছাড়লেও গ্রেপ্তার হন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান ও নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। এদের অনুপস্থিতে বন্ধ হয়ে গেছে অনেকগুলো কারখানা।
তাদেরকে নতুন করে ঋণ দিয়ে কারখানা চালু করার উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক কেন নেবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে আরিফ হোসেন বলেন, ‘অথনীতির স্বার্থে চালু করা হবে। একটি কারখনায় যদি ১০ হাজার কাজ করে, তাদের যদি চাকরি না থাকে তাহলে সমাজে এনার্কি তৈরি হবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করবে, বাংলাদেশ ব্যাংক তা তদারকি করবে।’
গভর্নর নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে নতুন কারখানা চালুর উদ্যোগ নেবেন কীভাবে, কারণ তার কাজ তো মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা; সাংবাদিকরা এমন প্রশ্নও করেন।
জবাবে মুখপাত্র বলেন, ‘গভর্নর চাচ্ছেন বন্ধ কলকারখানা চালু হোক।’
নতুন গভর্নর সংবাদ মাধ্যমে নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া কথা বলবেন না জানিয়ে আরিফ হোসেন বলেন, ‘গভর্নর মিডিয়ার সঙ্গে নিয়মিত হবেন না। প্রয়োজন হলে কথা বলবেন। বাকি যোগাযোগ মুখপাত্রের মাধ্যমে হবে।’
আগের সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নরের নেওয়া আর্থিক খাতের সংস্কার নীতিগুলো চলমান থাকবে জানিয়ে আরিফ হোসেন বলেন, ‘আগের সরকার ও গভর্নর খাদের কিনারা থেকে অর্থনীতিতে টেনে তুলেছেন। এখন সামষ্টিক অর্থনীতি কিছুটা নিম্ন পর্যায়ে থাকলেও তাতে গতি আনতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
আগের দিন তিন কর্মকর্তাকে বদলী, পরে প্রত্যাহার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিক্ষোভ সভা ও গভর্নরের উপদেষ্টার গাড়ির উপর হামলে পড়ার ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা ভুলন্ঠিত হয়েছে কি না, কেপিআই প্রতিষ্ঠানে এরকম উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরিতে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয় কি না, তা জানতে চান সাংবাদিকরা।
গভর্নরের বরাত দিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গভর্নরের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম শৃঙ্খলা ভঙ্গের মত কোনো পরিবেশ তৈরি হবে না। যারা মব সৃষ্টির চেষ্টা করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নীতি সহায়তা দিয়ে খেলাপীদের নিয়মিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে আসছে। সবশেষ গত সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে খেলাপী ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দিয়েছে।
ফের নতুন ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি সুদহার কমানোর উদ্যোগও নতুন গভর্নর নিবেন – এমন বার্তাও দিয়েছেন ব্যবসায়ী অঙ্গন থেকে নিয়োগ পাওয়া গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।


