পছন্দ-অপছন্দের সবজি নিয়ে কোনো জরিপ করা হলে, অনেকের অপছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকবে করলা। খসখসে, খাঁজকাটা গা এবং তীব্র তেতো স্বাদের কারণে অনেকের কাছেই এটি অপছন্দের। আবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করলা খাবারের পাশাপাশি লোকজ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বৈজ্ঞানিকভাবে মোমরডিকা কারেনটিনা নামে পরিচিত করলা শসা ও মেলনজাতীয় সবজি পরিবারের সদস্য। হাল আমলে ডায়াবেটিসের পক্ষে উপকারি খাবার হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার অনেক আগেই বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এর ব্যবহার ছিল।
জেনেটিক গবেষণা অনুযায়ী, করলার উৎপত্তি আফ্রিকায়। পরে এটি এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চাষের মাধ্যমে দৈনন্দিন খাদ্যাভাসের অংশ হয়ে উঠেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ২০০ সালের প্রাচীন সংস্কৃত নথিতেও এই সবজির উল্লেখ পাওয়া যায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর করলা আঞ্চলিক খাদ্য ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। পরে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া পেরিয়ে আফ্রিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও আমেরিকাতেও এর বিস্তার ঘটে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় করলার চাষ হয়। অঞ্চলভেদে এটি ‘বিটার মেলন’, ‘বালসাম পিয়ার’ ও ‘করলা’সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত।
খাবার ও ভেষজ উপাদান, দুইভাবে করলার ব্যবহার এর বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। কচি সবুজ করলা সাধারণত সবজি হিসেবে রান্না করা হয়। পাশাপাশি গাছটির বিভিন্ন অংশ ঐতিহ্যবাহী ভেষজ প্রস্তুতিতেও ব্যবহৃত হয়েছে। আয়ুর্বেদসহ বিভিন্ন প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে হজমের সমস্যা, লিভারের বিভিন্ন সমস্যা ও ডায়াবেটিসে করলা ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে।
করলার স্বাস্থ্যগুণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা। এতে কারান্টিন এবং পলিপেপটাইড-পির মতো কিছু উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে, যেগুলো গ্লুকোজের বিপাক ও ইনসুলিনের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব গবেষণার ভিত্তিতে করলাকে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
করলা আঁশেরও ভালো উৎস। পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার হজমশক্তি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এটি নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করতে পারে, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং খাবারের পর কার্বোহাইড্রেট শোষণের মাত্রা কমাতে পারে।
ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় হজম ও লিভারের স্বাস্থ্যের জন্যও করলার ব্যবহার রয়েছে। এর তেতো উপাদান হজমপ্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। একই সঙ্গে এতে পানির পরিমাণও বেশি হওয়ায় এটি হাইড্রেশনেরও ভালো উৎস হতে পারে।
করলার তেতো স্বাদই হয়তো এর সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য। তবে সেই তেতো স্বাদের মধ্যে রয়েছে আঁশ, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান। করলা ভিটামিন সি, ফোলেট ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেরও উৎস। এসব উপাদান শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ, করলা একই সঙ্গে খাবার ও লোকজ চিকিৎসার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করছে। তবে এর স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে আশাব্যঞ্জক গবেষণা থাকলেও কোনো রোগের চিকিৎসা বা ওষুধের বিকল্প হিসেবে করলা ব্যবহার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।


