কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলের বিস্তীর্ণ এক উন্মুক্ত এলাকায় একটি বড় বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপিত হয়েছে। খুরুশকুল, পোকখালী, পিএমখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নজুড়ে স্থাপিত মোট ২৩টি টারবাইন নিয়ে গড়ে উঠেছে ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার খুরুশকুল বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র। যা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
এই টারবাইনগুলো বঙ্গোপসাগর থেকে বয়ে আসা বাতাসকে কাজে লাগিয়ে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে তিন মিটারের বেশি হলেই টারবাইনগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। চার ইউনিয়নজুড়ে স্থাপিত এই প্রকল্পটি এখন পুরোপুরি চালু রয়েছে।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প। বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুতের পথচলা অবশ্য আজকের নয়। ২০০৫ সালে ফেনীর মুহুরী নদীর একটি বাঁধের কাছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) শূন্য দশমিক ৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হয়। এর তিন বছর পর ২০০৮ সালে, কুতুবদিয়ায় নির্মিত হয় এক মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্র।
সেই সময়ের প্রকল্পগুলো ছিল ছোট পরিসরের এবং অনেকটাই পরীক্ষামূলক। সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক হোম সিস্টেমের জন্য পরিচিত বাংলাদেশে বায়ু থেকে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তখনও অনেকটা অনিশ্চিত ছিল। এর দুই দশক পর খুরুশকুল সেই চিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনের নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ১৪ কোটি ৫০ লাখ কিলোওয়াট-ঘণ্টা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রত্যাশা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ‘ইউলিং পাওয়ার করপোরেশন’। এটি চীনের স্টেট পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের (এসপিআইসি) একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে প্রকল্পটি চালু হওয়ার ফলে বছরে প্রায় ৪৪ হাজার ৬০০ টন কয়লার ব্যবহার এবং প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে আসা বাংলাদেশের জন্য খুরুশকুল তাই কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত।
একসময় তুলনামূলক কম বায়ুপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুৎকে বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করা হতো। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি, সঠিক স্থান নির্বাচন ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে সেই ধারণা বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার উপকূলজুড়ে ঘুরতে থাকা ২৩টি টারবাইন যেন সেই পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতীক।
এগুলো শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো নয়। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি দেশের নিজস্ব নবায়নযোগ্য সম্পদকে কাজে লাগানোর একটি প্রচেষ্টার প্রতিফলন এবং জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রতিচ্ছবিও।

বঙ্গোপসাগর থেকে বয়ে আসা বাতাস দীর্ঘদিন ধরেই কক্সবাজারের মানুষের জীবনের অংশ। এখন সেই বাতাসই হয়ে উঠছে বিদ্যুতের উৎস।
খুরুশকুল প্রকল্প ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও বড় পরিসরে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের পথ তৈরি করবে, নাকি একটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবেই থেকে যাবে–তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ নীতি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের ওপর। তবে আপাতত টারবাইনগুলো ঘুরছে। সেই ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি ভবিষ্যতের একটি নতুন সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে আরও পরিচ্ছন্ন, আরও সবুজ নতুন এক বাংলাদেশের সম্ভাবনাও বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: সরকারের কাছে সৌরবিদ্যুৎ বিক্রিতে মুনাফা নিয়ে সংশয়


