কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে ধর্ষণ-হত্যা, তাজমিনের সঙ্গে কী ঘটেছিল

কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে ধর্ষণ-হত্যা, তাজমিনের সঙ্গে কী ঘটেছিল
কুমিল্লার লালমাইয়ে স্কুলছাত্রীকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। শনিবার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে। ছবি: সৌজন্যে
Advertisement
Advertisement

কুমিল্লায় ফসলি জমি থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগে ১৫ বছর বয়সী তাজমিন কক্সবাজারে গিয়েছিল। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় সে। বাসের টিকিট, হোটেলের নথি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় তার শেষ যাত্রার আগের ও পরের নানা তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি ধানখেতের আইল থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশে পাওয়া যায় ‘আইকনিক এন্টারপ্রাইজ’ বাসের একটি টিকিট। সেই টিকিটের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পারে, কক্সবাজার শহরের কলাতলীর একটি এজেন্ট কাউন্টার থেকে সেটি কাটা হয়েছিল।

কাউন্টারটির পরিচালক আসহাব আব্দুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাতে তার পরিচিত ২০ বছর বয়সী এক তরুণ এক কিশোরীকে সঙ্গে নিয়ে টিকিট কাটতে এসেছিলেন। তিনি ওই কিশোরীকে নিজের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

ওই তরুণের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্রে দুই থেকে তিন মাস ধরে তাদের যোগাযোগ ছিল। কিশোরীর অনুরোধে তিনি প্রথমে তাকে একা থাকার ব্যবস্থা করে দেন। পরে নিয়ে যান মেঘলা রিসোর্টে।

রিসোর্টের নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, তারা ৬ অক্টোবর চেক ইন করেন এবং পরদিন চেক আউট করেন। সেখানে দুইজনের পরিচয় স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে লেখা হলেও কিশোরীর বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। রিসোর্টের ফ্রন্ট ডেস্ক ব্যবস্থাপক মো. আবছার জানান, তরুণের জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হলেও কিশোরীর কোনো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়নি।

তরুণের দাবি, পরিবারের সদস্যদের ফোন আসতে থাকায় তিনি কিশোরীকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। বাসভাড়ার টাকা না থাকায় ধার করে টিকিট কাটেন এবং ৫০০ টাকা দিয়ে তাকে বাসে তুলে দেন।

তবে অনুসন্ধানে কক্সবাজারে তাজমিনের অবস্থান নিয়ে আরও তথ্য পাওয়া গেছে। শহরের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত তিনতলা একটি আবাসিক হোটেলের নথি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেয় তাজমিন। সেখানে তাকে রাজুর স্ত্রী ‘তানজু আক্তার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। রাজুর পরিচয় লেখা হয়েছিল বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।

হোটেলের এক কর্মী জানান, নিবন্ধনের খাতায় রাজুর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লেখা ছিল। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছিল। সেখানে এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা কক্ষ ছেড়ে যান।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বার্তা ও রিলসের মাধ্যমে রাজুর সঙ্গে তাজমিনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। তবে পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭ দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। অন্য একটি সূত্রের দাবি, পরিচয়ের সময়কাল প্রায় পাঁচ মাস।

আরও পড়ুন

রাজু তিন বছর ধরে কক্সবাজার শহরের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমিনের জন্য তিনি ৯০০ টাকা মূল্যের বাসের টিকিট কেটে তাকে বাড়ি ফেরার বাসে তুলে দিয়েছিলেন।

কক্সবাজারের ‘কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর’-এর কাউন্টার প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাত আটটার পর তাজমিন ও রাজু কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের জন্য ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট সংগ্রহ করেন। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়।

রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় পৌঁছে বাড়ির ফটক বন্ধ থাকার কথা তাকে জানিয়েছিল তাজমিন। পরে রেলস্টেশনে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়ে তার বাসায় থাকার সিদ্ধান্তের কথাও বলেছিল সে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়।

রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্য, কুমিল্লায় পৌঁছে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর ফোনে কথা হচ্ছিল। ওই সময় অটোরিকশাচালকের বিষয়েও কথা বলেন তিনি। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের ফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

হত্যাকাণ্ডের খবর জানার পর রাজু নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে কান্নাকাটি করেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি হোটেল থেকে ছুটি নিয়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

তাজমিনের নিখোঁজ হওয়ার প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়। এরপর রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায় সে। সেখান থেকে মুঠোফোনে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান। পরে কক্সবাজারে পৌঁছায় তাজমিন।

বাড়ি ফেরা হলো না তাজমিনের

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে মো. সুমন মিয়ার (৩৫) সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে।

পুলিশের তথ্যমতে, সুমন তাকে রেসকোর্সে না নিয়ে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাজমিনকে হত্যা করা হয়।

৮ অক্টোবর সকালে ওই এলাকার একটি ধানখেতের আইল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেখানো স্থান থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।

মেয়ের অবস্থান জানতে পারেননি মা

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না দিয়ে শুধু এক মেয়ে বন্ধুর বাসায় থাকার কথা বলেছিল। তিনি মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও সে কার কাছে আছে, তা স্পষ্ট না করায় সম্ভব হয়নি।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার করা মুঠোফোনের কলতালিকা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ নিয়ে অধিকতর তদন্ত চলছে।

তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad